আকাশের অন্ধকার দূর করেছে শুধু জ্বলজ্বলে শুকতারার আলোয়। কে জানে হয়ত এই শুকতারার দেশের নদীতীরে, জ্যোৎস্নামাখা বনপ্রান্তরে, উপবনে মৃত্যুহীন জরাহীন দেবকন্যারা মন্দারবীথির ঘন ছায়ায় প্রণয়ীজনের সঙ্গে গোপনে মিলনে সারারাত্রি কাটায়…তৃপ্তিহীন অমর প্রেম তাদের চোখের জ্যোৎস্নায় জেগে থাকে, লজ্জাভরা হাসিতে ধরা দেয়। পীত সূর্যাস্তের আলোয় করুণ সুরে বহুদূরের শূন্য বেয়ে সেখানে ভেসে এসে সান্ধ্য আকাশকে আরও মধুর করে তোলে–কোথা থেকে সে সুর আসে কেউ জানে না..কেউ বলে বহু দূরের কোন নক্ষত্রলোকে এক বিরহী দেবতা একা বসে বসে এমনি তাঁর বীণা বাজান, সেই সুর ভেসে আসে প্রতি সন্ধ্যায়..ঠিক কেউ বলতে পারে না…কেবল আধ-আলো আধ-ছায়ায় পুষ্পবীথিতে লুকিয়ে বসে সুখী প্রেমিক-প্রেমিকা হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে… তাদের চোখে অকারণে জল এসে পড়ে…অবাক হয়ে তারা পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে থাকে।
হঠাৎ আমার সামনে অস্পষ্ট অন্ধকারে একজন তরুণ যুবক হাসিমুখে এসে দাঁড়িয়ে বললে–এস আমার সঙ্গে–
তার গেরুয়া উত্তরীয় আমার গায়ে এসে পড়ছে উড়ে। আমি বলি–কোথায় যাব? কে আপনি?
নবীন বৈষ্ণব বললে–আমি জীবগোস্বামী–আমারই পদাবলী তুমি সন্ধেবেলা শুনেচ যে। এত শীগগির ভুলে যাও কেন হে ছোকরা? এস আমি বৃন্দাবনে যাব। শ্রীকৃষ্ণকে আমার পাওয়া চাই।
–আপনি তো মারা গিয়েছেন আজ তিন-শো বছরের ওপর। আপনি আবার কোথায়?
—পাগল! কে বলে আমি মরেছি? আর মলেই কি আমার যাওয়া ফুরিয়েছে নাকি? এসো…এসো..আমি সংসার ছেড়েছি, সব ছেড়েছি তাঁর জন্যে। দেখছ না পাগল হয়ে পথে পথে বেড়াচ্ছি?
এমন ভাবে কথাগুলো সে বললে আমি যেন শিউরে উঠলুম। বললাম–তা তো দেখতে পাচ্ছি, পাগলের আর বাকী কি? আপনি যান, আমি যীশুখৃষ্ট্রের ভক্ত, আমি বৃন্দাবনে যাব না। তাছাড়া মালতীকে ফেলে এক পা-ও এখান থেকে নড়ছি নে আমি।
তরুণ বাউল হেসে একতারা বাজাতে বাজাতে চলে গেল––পথের মাঝে নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে, যেতে যেতে দূরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল…অন্ধকারের মধ্যে থেকে তার গলার মিষ্টি সুর তখনও যেন ভেসে আসছে…
মধু রিপুরূপমুদারম
মধু রিপুরূপমুদারম
সুখদং সুখদং ভবসারম
হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে শেষরাতের ঠাণ্ডায় কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম কে জানে–শিশিরে কাপড়-চোপড় ভিজে গিয়েছে। ফরসা হবার আর দেরি নেই।
.
১২.
দেখতে দেখতে এখানে ছ-সাত মাস হয়ে গেল। এখানে সময় কাটে কোথা দিয়ে বুঝতে পারি নে। সকালে আখড়ার কাজ করি, বিকেলে গোটাকতক ছেলে নিয়ে একটা পাঠশালা করি, তাতে যা পাই উদ্ধব বাবাজীর হাতে তুলে দিই। একদিন মালতী আমায় বললে– ছেলে পড়িয়ে যা পান, তা আপনি উদ্ধব জ্যাঠার হাতে দেন কেন? থাকা-খাওয়ার দরুন টাকা নেওয়া তো এখানে নিয়ম নেই, ও-টাকা আপনি নিজে রেখে দেবেন, আপনারও তো নিজের টাকার দরকার আছে। আমি বললাম–তা কি করে হয় মালতী, আমি এমনি খেতে পারি নে। আর আমি তো খাওয়া থাকা বলে টাকা দিই নে, বিগ্রহের সেবার জন্যে দিই। এতে দোষ কি?
সেদিন মালতী আর কিছু বললে না। দিন-চারেক পরে আবার এক দিন ওই কথাই তুললে। টাকা আমি কেন দিই? আখড়া তো হোটেলখানা নয় যে এখানে টাকা দিয়ে খেতে হবে? ওতে তার মনে বাধে। তা ছাড়া আমার তো টাকার দরকার আছে। আমি তাকে বুঝিয়ে বলি, টাকা না দিতে দিলে আমার এখানে থাকা হবে না। চলে যেতে হবে।
সেদিন থেকে মালতী এ নিয়ে আর কিছু বলে নি।
পাড়াগাঁয়ের দিনগুলো অদ্ভুত কাটে।–দীঘির পাড়ে রাঙামটির উঁচু বাঁধে এ-সময়ে একরকম ফুল ফোটে, ছায়া পড়ে এলে মাঝে মাঝে একা গিয়ে বসি। বাগদীদের মেয়েরা হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তুলে মাছ ধরে, আখড়ার গোয়াল থেকে সাঁজালের ধোঁয়া ঘুরে ঘুরে ওঠে–তালের দীর্ঘসারির ফাঁক দিয়ে এই সন্ধ্যায় কতদূর দেখতে পাই–দাদার দোকান, দাদার বাতাসার কারখানা, সীতার শ্বশুরবাড়ি, তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা, নিমচাঁদের বৌ, শৈলদি ….
মালতীর স্বভাব কি মধুর! কি খাটুনিটা খাটে আখড়ায়–এক দিন উঁচু কথা শুনি নি ওর মুখে–কারও ওপর রাগ দেখি নি–বাপের মেয়ে বটে!
আখড়ায় ছোট একটা অশ্বত্থ-চারা আছে, উদ্ধবদাস রোজ স্নান করে এসে গাছটা প্রদক্ষিণ করে, গাছটাকে জল দেয়। এ তার রোজ করাই চাই। একদিন মালতীকে ডেকে বলি–তোমার উদ্ধব জ্যাঠা পাগল নাকি? ও-গাছটার চারিপাশে ঘোরার মানে কি? মালতী বললে–কেন ঘুরবে না সবাই তো আর আপনার মত নাস্তিক না। অশ্বত্থগাছ নারায়ণ–ওর সেবা করলে নারায়ণের সেবা করা হয়–জানেন কিছু?
আমি বললুম–তাহ’লে তুমিও সেবাটা শুরু করে পুণ্যি কিছু করে নাও না সময় থাকতে?
মালতী শাসনের সুরে বললে–আচ্ছা, আচ্ছা থাক। আপনি ও-রকম পরের জিনিস নিয়ে টিটকিরি দেন কেন? ওদের ওই ভাল লাগে, করে। আপনার ভাল লাগে না, করবেন না। তা নয়, সারাদিন কেবল এর খুঁত ওর খুঁত–ছি, আপনার এ স্বভাব সারবে কবে?
বললাম–তোমার মত উপদেশ দেওয়ার মানুষের দেখা পেতাম যদি তাহলে এতদিন কি আর স্বভাব সারে না? তা সবই অদৃষ্ট!
কথা শেষ করে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলতেই মালতী রাগ ক’রে আমার সামনে থেকে উঠে গেল।
বিকেলে কিন্তু ওকে আমার কাছেই আসতে হ’ল আবার। নিকটে নকাশিপাড়া গাঁয়ে একটা যাত্রার দল ছিল, তাদের অধিকারী এসে উদ্ধবদাসকে বলে–বাবাজী, তিন মাস বসে আছি, বায়না-পত্তর একদম বন্ধ। দল তো আর চলে না। কালনা থেকে ভাল বাজিয়ে এনেছিলাম–ঢোলকে যখন হাত দেবে, আঃ, যেন মেঘ ডাকচে, বাবাজী। তা অপনাদের আখড়ায় এক দিন শ্যামসুন্দরজীউকে শুনিয়ে দিই। কিছু খরচ দিতে হবে না, তেল তামাক আর কিছু জলখাবার–
