দিন-পনের কেটে গেল।
মালতীর বাবার ইতিহাস শুনে বুঝেছি আমি এখানে ছ-মাস থাকলেও এরা আমায় চলে যেতে বলবে না–বিশেষ করে মালতী তো বলবেই না। কিন্তু আমার পক্ষে থাকাও যেমন অসম্ভব হয়ে উঠছে, চলে যাওয়া তার চেয়েও অসম্ভব যে! মালতীকে নতুন চোখে দেখতে শিখেছি ওর বাবার পরিচয় শুনে পর্যন্ত। মালতীর বাবার মত লোকের সন্ধানে কত ঘুরেছি, এতদিন পরে সন্ধান মিলেছে, কিন্তু চাক্ষুষ দেখা হ’ল না। জগতের সকল নিঃস্বার্থ নিঃসম্পর্ক লোক পরস্পরের সগোত্র–তা সে লোক গঙ্গাতীরে নবদ্বীপের আকাশেই প্রথম দিনের আলো দেখুন কিংবা দেখুন কপিলাবস্তু বা প্যালেস্টাইন বা আসিসির ওপরকার ইতালীর ইন্দ্রনীল আকাশের তলে।
মালতীকে কত কথা বলবার আছে ভাবি কিন্তু ওর সঙ্গে আর আমার তেমন নির্জনে দেখা হয় না। আমি দেখি মালতীর আশাতেই আমি সারাদিন বসে থাকি–ও কখন আসবে। ও থাকে সারাদিন নিজের কাজে ব্যস্ত–হয়ত দেখলাম ঘর থেকে ও বার হ’ল, ভাবি আমার কাছেই আসছে বুঝি–কিন্তু তা না এসে থালা-হাতে কাকে ভাত দিতে গেল নয়ত আলনাতে কাপড় টাঙাতে ব্যস্ত আছে। হয়ত একবার থাকতে না পেরে ডেকে বলি–ও মালতী–
মালতী বললে–আসছি।
আমি বসেই আছি, বেলা দুপুর গড়িয়ে গেল। ও এল কই?
দিনগুলো প্রায়ই এই রকম। তা ছাড়া আমার ওপর ওর কোন বিশেষ পক্ষপাত আছে বলে আমার মনে হয় না। প্রথম দিনকতক যে সে রকম ধারণা না হয়েছিল এমন নয়। কিন্তু এখন সে ভুল ভেঙেছে। সকলকে যেমন যত্ন করে, আমাকেও তেমনি করে।
একদিন বসে উদ্ধবদাসের একতারা মেরামত করছি–মালতী দেখতে পেয়ে উঠোনের ও-কোণ থেকে চঞ্চলপদে এসে সামনে দাঁড়াল। সকৌতুক সুরে বললে–ও! কাকার সেই একতারাটা? আপনি সারাচ্ছেন নাকি? কি জানেন আপনি একাতারা সারানোর?
আমি অপ্রতিভ না হয়ে বললাম–জানাজানির কি আছে এতে? খানিকটা তার হাতে এসেছিল–তাই পরিয়ে দিচ্ছি। কথা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে হাসিমুখে চোখ তুলে চাইতেই ওর সঙ্গে চোখাচোখি হ’ল। সেই মুহূর্তে হঠাৎ আমার মনে হ’ল মালতীকে এখানে একা নিঃসহায়, নির্বান্ধব, রিক্ত অবস্থায় ফেলে আমি কোথাও যেতে পারব না। ওর এখানে কে আছে? একপাল অনাত্মীয়, অশিক্ষিত গেঁয়ো বৈষ্ণবের মেলার মধ্যে ওকে ফেলে রেখে যাব কি করে? তারা ওর কেউ নয়। তারা ওকে বুঝবে না। তার চেয়ে আমার মনের দেশে ও আমার অনেক আপন, আমার নিকটতম প্রতিবেশী।
ভাবলাম মালতীকে সব কথা বলি। বলি, মালতী, সংসারে তোমারও কেউ নেই, আমারও কেউ নেই। তুমি সাধু বাপের সতী মেয়ে, তোমার সংসার-বিবাগী আপন-ভোলা বাপের আশীর্বাদ ওই শ্যামসুন্দর তমালতরু ছায়ার মত তোমাকে ঘিরে রেখেছে জানি, কিন্তু আমিও যে-সন্ধানে বেরিয়েছি, সে-সন্ধান সফল হবে না তুমি যদি পাশে এসে না দাঁড়াও।
কিন্তু তার বদলে বললাম–ভাল কথা মালতী, তোমাকে অনেক দিন থেকে বলব ভাবছি। উদ্ধব বাবাজীকে বলে আমায় এখানে একটা পাঠশালা করার ব্যবস্থা করে দিতে পার? আমার কিছু হয় তা থেকে।
মালতী এসে দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে বসল। ওর মুখের পাশটা দেখা যাচ্ছে, একটা সুকুমার লাবণ্য যেন ওর মুখের চারিপাশে ঘিরে আছে–এক ধরনের সুন্দর মুখ আছে, মনে হয় যেন তাদের মুখের চারিপাশে একটা অদৃশ্য সৌন্দর্যজালের বেষ্টনী রয়েছে, যখন কথা না বলে চুপ করে থাকে, তখন তাদের মুখের এই ভাবটা সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে– মালতীর মুখ সেই ধরনের। আমার কথায় ওর মুখচোখ চিন্তাকুল হয়ে উঠল, যেন কি একটা বিষম সমস্যা তার ঘাড়ে আমি চাপিয়ে দিয়েছি। বললে–কিন্তু এখানে যা ভেবে করবেন, তার কিছু হবে না। এখানে মাইনে দেবে না কেউ। এখানে ভদ্রলোক নেই। দ্বারবাসিনীতে কামারেরা আছে, ওদের কলকাতায় গাড়ির কারখানা, সেইখানেই থাকে। সরকারেরা তিন বছর পরে এসেছিল পুজোর সময় দেশে।–তারপর হেসে ছেলেমানুষের মত ঘাড় দুলিয়ে বললে–ধান নিয়ে ছেলে পড়াতে পারবেন? এদেশে মাইনের বদলে ধান দেয়। নাঃ, সে-সব আপনার কাজ নয়। তা আপনি তো এখানে জলে পড়ে নেই? হাতে কিছু নেই, একদিন হবেই। যতদিন না হয়, এখানে থাকুন। আপনাকে এ অবস্থায় কোথাও যেতে দেব না। এখানে থাকতে কষ্ট হচ্ছে বোধ হয়, না? সত্যি কথা বলুন।
–সত্যি কথা কি সব সময় বলা যায় মালতী?
—কেন, বলুন না কি বলবেন?
—এখন থাক, আমার কাজ আছে। শোন, উদ্ধবদাসের একতারাটা এখানে রইল, ব’লো তাকে। তোমার জন্যে সারানো হ’ল না।
মালতী অবাক হয়ে চেয়ে থেকে বললে–কোথায় যাবেন? শুনুন। বা রে, অদ্ভুত মানুষ কিন্তু আপনি!
বাইরের মাঠে এসে দাঁড়িয়ে মনে হ’ল আকাশ-বাতাসের রূপ ও রং যেন এই এক মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেছে আমার চোখে। মালতী ও-কথা বললে কেন যে, আপনাকে এ অবস্থায় কোথায় যেতে দিতে পারব না?–এই সেই মাঠ, সেই নীলাকাশ, মাঠের মধ্যে দ্বারবাসিনীর কামারদের কাটানো বড় দীঘিটা, সবই সেই আছে–কিন্তু মালতীর মুখের একটি কথায় সব এত সুন্দর, এত অপরূপ, এত মধুময় হয়ে উঠল কেন?
ঠিক সেই অদ্ভুত রাত্রিটির মত- মাঠের মধ্যে নির্জন নদীর ধারে শুয়ে যেমন হয়েছিল সেদিন। অনুভূতি হিসেবে দুই-ই এক। কোন প্রভেদ নেই দেখলুম। কোথায় সেই বিরাট দেবতা, আর কোথায় সেই মালতী!
তারপর দিন-কতক মালতীর সঙ্গে কি জানি কেন আমার প্রায়ই দেখা হয়। সময়ে অসময়ে, কারণে-অকারণে ও আমার সামনে যখনই এসে পড়ে কিংবা কাছ দিয়ে যায়, দাঁড়িয়ে দুটো কথা না বলে যায় না। হয়ত অতি তুচ্ছ কথা–বসে আছি, সামনে দিয়ে যাবার সময় বলে গেল–বসে আছেন? এ-কথা বলবার কোন প্রয়োজন নেই–কিন্তু সারাদিনের এই টুকরো টুকরো অকারণ কথা, একটুখানি হাসি, কৃত্রিম শ্লেষ, কখনো বা শুধু চাহনি..এর মধ্যে দিয়ে ওর কাছে আমি অনেকটা এগিয়ে যাই–ও আমার কাছে এগিয়ে আসে। এতে করে বুঝি ও আমার অস্তিত্বকে উপেক্ষা করে চলতে পারে না–ও আমার সঙ্গে কথা বলে আনন্দ পায়।
