সন্ধ্যার পরে আমি তালপাতার চাটাইয়ে বসে একটি বৃদ্ধ বৈষ্ণবের একতারা বাজনা ও গান শুনচি–এমন সময় একটি মেয়ে আমার সামনে উঠোনে এসে জিজ্ঞেস করলে– আপনি রাত্তিরে কি খাবেন–?
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম–আমায় বলছেন?
মেয়েটি শান্ত সুরে বললে–হ্যাঁ। রাত্তিরে কি ভাত খান?
আমি থতমত খেয়ে বললাম–যা হয়, ভাতই খাবো। আপনাদের যাতে সুবিধে।
মেয়েটি বললে–আমাদের সুবিধে নিয়ে নয়–এখানে আপনার যা ইচ্ছে হবে খেতে তাই বলবেন। চা খান কি আপনি?
এ পর্যন্ত কোন জায়গায় এমন কথা শুনি নি, কোন মন্দিরে বা বৈষ্ণবের আখড়াতেই নয়। ডেকে কেউ জিজ্ঞেস করে নি আমি কি খেতে চাই। বললাম–চা খাওয়া অভ্যেস আছে, তবে সুবিধে না হ’লে–
মেয়েটি আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই চলে গেল এবং মিনিট কুড়ি পরে এক পেয়ালা চা নিয়ে এসে নিঃসঙ্কোচে আমার হাতে দিলে। বললে–চিনি ঠিক হয়েছে কিনা দেখুন।
আবার তাকে দেখলাম রাত্রে খাবার সময়ে। লম্বা দাওয়ায় সারি দিয়ে সাত-আটজন লোক খেতে বসেছে, মেয়েটি নিজের হাতে সবাইকে পরিবেশন করলে। প্ৰকাণ্ড বড় ভাতের ডেকচি নিজে দু-হাতে ধরে নিয়ে এসে আমাদের সামনে রাখলে–তা থেকে থালা করে ভাত নিয়ে সকলকে দিতে লাগল। আমার পাশের লোকটিকে বললে–ও কি শ্যামা কাকা, নাউয়ের ঘণ্ট দিয়ে আর দুটো খান। ওবেলা তো খাওয়াই হয় নি!
সে সম্ভ্রমে বললে–না দিদিঠাকরুন, আমাকে বলতে হবে না আপনার। পেটে জায়গা নেই। তেঁতুল মেখে বরং দুটো খাবো–
–হ্যাঁ কাসছেন, তেঁতুল না খেলে চলবে কেন? দুধ দিচ্ছি–
তারপর আমার সামনে এসে বললে–আপনার বোধ হয় ওবেলা খাওয়াই হয় নি? আপনাকেও দুধ দিচ্ছি।
এতগুলো লোক খেতে বসেছে, দুধ দেওয়া হ’ল মোটে তিনজনকে–কিন্তু সে ব্যক্তিগত প্রয়োজনবিশেষে এবং তার বিচারকর্ত্রী ওই মেয়েটিই। আমার কৌতুক হ’ল ভারি।
রাত্রে শুয়ে শুয়ে ভাবলাম চমৎকার মেয়েটি ত! দেখতে সুশ্রী বটে, তবে খুব সুন্দরী নয়। কিন্তু আমি ওরকম মুখের গড়ন কখনও দেখি নি, প্রথমে সন্ধ্যাবেলায় ওকে দেখেই আমার মনে হয়েছিল একথা। বার বার চেয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়–সে ওর সুন্দর ডাগর চোখ দুটির জন্যে, না ওর মুখের একটি বিশিষ্ট ধরনের লাবণ্যময় গড়নের জন্যে, রাত্রে তা ভাল বুঝতে পারি নি। মেয়েটি কে? নিতান্ত ছেলেমানুষ তো নয়–সারাদেহে যৌবনশ্রী ফুটে উঠেছে পরিপূর্ণ ভাবেই–এখানে ওভাবে থাকে কেন? আখড়ার সঙ্গে ওর কি সম্পর্ক? নানা প্রশ্ন মনে উঠে ঘুম আর আসে না।
পরদিন সকালে মেয়েটির সঙ্গে অনেকবার দেখা হ’ল। অতিথিদের কারও অযত্ন না হয় সেদিকে দেখলাম ওর বেশ দৃষ্টি আছে। এ অঞ্চলে চালে কাঁকর ব’লে সে নিজে সকালে কুলো নিয়ে বসে প্রায় আধমণ চাল ঝাড়লে। বেলা ন’টার সময় হঠাৎ এসে আমায় বললে–আপনার ময়লা জামা-কাপড় যদি পুঁটলিতে থাকে ত দিন, কেচে দেবো। আপনার গায়ের জামাটাও ময়লা হয়ে গিয়েছে, খুলে দিন। খুব রোদ, দুপুরের মধ্যে শুকিয়ে যাবে।
আমি প্রথমটা একটু সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছিলাম। তার পর দেখলাম সে সকলকেই জিজ্ঞেস করছে তারও ময়লা কাপড়-চোপড় কিছু আছে কিনা। একজন বৃদ্ধ বাউলের গেরুয়া আলখাল্লা ময়লা হয়েছিল বলে খুলিয়ে নিয়ে গেল। পরে শুনলাম মেয়েটি ওরকম প্রায়ই করে, আখড়াতে ময়লা-কাপড়ে থাকবার জো নেই।
এখানে দিন দুই কাটবার পরে আর একটা জিনিস আমার বিশেষ করে চোখ পড়ল যে, মেয়েটির মধ্যে কোন মিথ্যে সঙ্কোচ নেই, সহজ সিধে ব্যবহার, কি কাজে, কি কথাবার্তায়। সজীব ও দীপ্তিময়ী, যেন সঞ্চারিণী দীপশিখা, যদি শ্যামাঙ্গী মেয়েকে দীপশিখার সঙ্গে তুলনা করা যায়। তৃতীয় দিন বিকেলে এসে বললে-পুকুরপাড়ের বাগান দেখেছেন? আসুন দেখিয়ে নিয়ে আসি।
এই কথাটা আমার বড় ভাল লাগল–এ পর্যন্ত আমি কোন মেয়ে দেখিনি যে বাগান ভালবাসে, দেখাবার জিনিস ব’লে মনে করে।
ওর সঙ্গে গেলাম। অনেক গাছ আমাকে সে চিনিয়ে দিলে। কাঞ্চন ফুলের গাছ এই প্রথম চিনলাম। এক কোণে একটা বড় তমাল গাছের তলায় ইটের একটা তুলসীমঞ্চ ও বেদী দেখিয়ে বললে–বাবা এখানে বসে জপ করতেন।
জিজ্ঞেস করলাম–আপনার বাবা এখন কোথায়?
মেয়েটি কেমন যেন একটা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে বললে–বাবা তো নেই, এই চার বছর হ’ল মারা গিয়েছেন। এই যে পুকুরটা, বাবা কাটিয়েছিলেন, আর এই বকুলগাছের ওপাশে বিষ্ণুমন্দির তুলছিলেন, শেষ করে যেতে পারেন নি।
এই কথায় সূত্র খুঁজে পেলাম ওর সম্পূর্ণ পরিচয় জিজ্ঞেস করবার। এ দু-দিন কাউকে ওর সম্বন্ধে কোন কথা বলি নি, পাছে কেউ কিছু মনে করে। কৌতূহলের সঙ্গে বললাম– আপনার বাবার নামেই বুঝি এই আখড়া?
–কি, লোচনদাসের আখড়া? তা নয়, আমরা ব্রাহ্মণ, আমার বাবার নাম ছিল কাশীশ্বর মুখুয্যে। লোচনদাস এই আখড়া বসান, কিন্তু মরবার সময়ে বাবার হাতে এর ভার দিয়ে যান। তারপর বাবা আট-ন’ বছর আখড়া চালান। আখড়ার নামে যত ধানের জমি, সব বাবার। আসুন, বিষ্ণুমন্দির দেখবেন না?
মনে ভাবি বিষ্ণুমন্দির তুচ্ছ, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত আমি সঙ্গে যেতে রাজী আছি। পুকুরপাড়ের একটা বকুলগাছের পাশে একটা আধ-তৈরি ইটের ঘর। মেয়েটি বললে– গাঁথা শেষ হয় নি তো, হঠাৎ বাবা–তাইতে আদ্দেক হয়ে আছে। কাঁচা গাঁথুনি, আর বছরের বর্ষায় ওদিকের দেওয়ালের খানিকটা আবার ভেঙে পড়ে গিয়েছে।
