সীতার কথা মনে হয়। আচ্ছা, এই রাত্রে এতক্ষণ সে কি করছে? যে জীবনের মধ্যে সে আছে, সে জীবনের জন্যে সে তৈরী হয় নি। হয়ত রান্নাঘরে বসে এতক্ষণে এইরকম রাঁধচে, ও অত বই পড়তে ভালবাসে, তাদের ঘরে একখানাও বই নেই, বই পড়া হয়ত সেখানে ঘোর অপরাধ–যেমন ছিল জ্যাঠাইমার কাছে। জীবনের যে-কোনো আনন্দভরা অভিজ্ঞতার সময়েই সীতার ব্যর্থ জীবনের কথা আমার মনে না এসে পারে না।
সবাই মিলে খেতে বসলাম। রান্না হ’ল বড়ির ঝোল, আলুভাতে, পটলভাজা। কাপাসীর মা অবিশ্যি দেখিয়ে দিল। কাল ঠিক এই সময়ে খাগড়াঘাটের পথে বটতলায় চৌধুরী-ঠাকুর ভজন গাইচে। কি খারাপ লোকটা! টাকার দরকার ছিল, আমায় বললে তো আমি দিতামই। চুরি করে কি হ’ল!
জুড়ন বৈরাগী খাওয়া-দাওয়ার পরে গল্প করতে লাগল। বললে–শুনুন দাদাঠাকুর, এই যে কাপাসীর মা দেখচেন, এর বাবা অনেক টাকা জমিয়ে মারা গিয়েছিল। খেতো না, শুধু টাকা জমাতো। মরবার সময় ভাইকে বললে, অমুক জায়গায় মালসায় টাকা পোঁতা আছে, নিয়ে এসে আমায় দেখা। তা এই পানচালার কোণে ভাঙা উনুনের মধ্যি মালসা পোঁতা ছিল–কেউ জানতো না। মরবার সময় তাই টাকার মালসা সামনে নিয়ে খোলে। টাকা দেখতি দেখতি মরে গেল।
–সে টাকা কে পেলে তার পর?
–তারপর বুড়ো তো মরে গেল। তার ভাই রটালে মালসাসুদ্ধ টাকা সেই রাতি গোলমালে চুরি হয়েছে। এমন কি টাকার অভাবে বুড়োর ছেরাদ্দটাও হ’ল না। পেটের ওপর বাণিজ্য করে টাকা জমিয়ে গেল, নিজের ভোগে তো লাগলোই না–একটিমাত্র মেয়ে। এই কাপাসীর মা, তার ভোগেও হ’ল না। টাকার মালসা রাতারাতি কে যে কোথায় সরিয়ে ফেললে–
কাপাসীর মা ঝাঁঝের সঙ্গে বলে উঠল–হ্যাঁগো হ্যাঁ। সরিয়ে ফেলতে এসেছিল পাড়ার লোক! যে নেবার সে নিয়েছে। আমি কি আর কিছু জানি নে, না বুঝি নে? ধম্ম আছেন মাথার ওপর–তিনি দেখবেন। ছ-মাসের মেয়ে নিয়ে বিধবা হয়ে লোকের দোর দোর ঘূরিচি দুটো ভাতের জন্যি–আমায় যিনি বাপের ধনে–
বাবুরাম বললে–আর শাপমন্নি করো না বাপু। তোমার অদেষ্টে থাকত, পেতে। বাদ দেও ওসব কথা। উনুনে আগুন আছে কিনা দেখো তো, আর একবার কলকেটা ধরাই।
ওদের মধ্যে আর একজন বললে–ও জুড়নখুড়ো, স্বরূপগঞ্জের বাজারে কাল দুপুরের আগে পৌঁছানো যাবে না?
–দুটোর কম হবে না। ছ’ডী কোশ, তার আগে খাওয়া-দাওয়া করে নেওয়া যাবে।
বাবুরাম বললে–এবার কেঁদুলির মেলায় লোক যাচ্ছে কই তেমন জুড়নখুড়ো? …সে বছর দেখেছিলে তো? পথে সারারাতই লোক হাঁটতো।
অদ্ভুত লাগছিল এ রাতটি আমার কাছে। এত কথাও মনে এনে দেয়! ঘুম আর আসে না। ভাবছিলাম মানুষ এত অল্পেও সুখী হয়? আর সুখ জিনিসটা কি অনির্দেশ্য রহস্যময় ব্যাপার–এই নির্জন রাত্রে মুক্ত অপরিচিত প্রান্তরের মধ্যে তারাখচিত আকাশের নীচে শুয়ে সবাই সুখের স্বপ্ন দেখছে–কিন্তু একজনের সুখের ধারণার সঙ্গে অন্য আর একজনের ধারণার কি বিষম পার্থক্য!
সকালে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পশ্চিম মুখে হাঁটি। রাঢ় দেশের বড় বড় মাঠের ওপর দিয়ে। রাঙা বালি, দিগন্তে তালবনের সারি। হয়ত মাঠের মাঝে প্রাচীন কালের প্রকাণ্ড দীঘি, তালবনে ঘেরা কি ফাঁকা জায়গা এ-সব! মনে হত যেন সীমাহারা দিকসমুদ্রে ভেলা ভাসিয়ে চলেছি, কোন অজ্ঞাত দিগন্তের বননীল উপকূলে গিয়ে ভিড়বো, কোনখানে তমালতরুনিরে বনভূমি শ্যামায়মান, সেখানে গন্ধভরা অন্ধকার বীথিপথ বেয়ে অভিসারিকারা চিরদিন পা টিপে টিপে হাঁটে বৃন্দাবনের দিন ফুরিয়ে গেল, মহাভারতের যুগ কেটে গেল, যমুনার তটে কেলিকদম্বের ছায়া কালের অন্ধকারে লুকিয়েছে, তবুও ওদের ও যাওয়ার শেষ হবে না, আমারও না।
মাঠের পথের প্রথমটায় কেঁদুলি মেলার লোকজনের সঙ্গে দেখা হত। পরে আর তেমন লোক দেখি নি, এত বড় মাঠের মধ্যে অনেক সময় আমি একাই পথিক। এই ধু ধু সীমাহীন প্রান্তরে সূর্যাস্তের কি মূর্তি! আমাদের অঞ্চলে কোনোদিন তা দেখি নি। অন্ধকার হলে মাঠের মধ্যেই কতদিন রাত কাটিয়েছি। ছেলেবেলায় চা-বাগানে কাটিয়ে এই শিক্ষা পেয়েছিলাম, রাত্রিতে যে কোথাও আশ্রয় নিতে হবে, একথা মনেই ওঠে না। শীতের দেশ নয়, ঘন হিমারণ্যের হিংস্র শ্বাপদ নেই এখানে–নিতান্ত নিরীহ, নিরাপদ দেশ–এখানে নক্ষত্রভরা মুক্ত আকাশের চাঁদোয়ার তলায় মাটির ওপর যা-হয় একটা কিছু পেতে রাত কাটানোর মত আনন্দ খাট-পালঙ্কে শুয়ে পাইনি।
একদিন এই অবস্থায় একটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হ’ল। একটা অপূর্ব নাম-না-জানা অনুভূতির অভিজ্ঞতা। মুখে সে কথা বলা যায় না, বোঝানো যায় না, শুধু সেই-ই বোঝে যার এ রকম হয়েছে।
সকালে বামুনহাটি বলে একটা গ্রামে এক গ্রাম্য হাতুড়ে কবিরাজের অতিথি হয়েছিলুম। সেদিন তাঁর স্ত্রী একটি রণচণ্ডী–যতক্ষণ সেখানে ছিলাম, তাঁর গালবাদ্যের বিরাম ছিল না। আমি গিয়ে সবে বসেছি, তিনি দোরের আড়াল থেকে স্বামীর উদ্দেশে আরম্ভ করলেনও–অলপ্পেয়ে মিনসে, আমার সঙ্গে তোমার এত শত্তুরতা কিসের বল দিকি? রান্নাঘরের রোয়াকে চালা তুলতে তোমায় বলেছে কে? গরমে একে ঘরের মধ্যে টেঁকা যায় না উনুন জ্বললে, যাও বা একটু হাওয়া আসতো, চালা তুললেও হাওয়া আসবে তো ও ড্যাকরা? ওই অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে তোমার পিণ্ডি রাঁধবো খেও।
