–কেন, কি হয়েচে?
–তোমার মাথা ভাল না, এ আমিও জানি নবীনও দেখেচে বলচে। হিসেব-পত্রে প্রায়ই গোলমাল হয়। এ-রকম লোক দিয়ে আমার কাজ চলবে না। স্টেটের কাজ তো ছেলেখেলা নয়!
নবীন এবার আমায় শুনিয়েই বললে–এই তো সেদিন আমার সামনেই হিসেব মেলাতে মেলাতে মৃগীরোগের মত হয়ে গেল–আমি তো ভয়েই অস্থির।
মেজবাবুকে বিদ্বান বলে আমি সম্ভ্রমের চোখেও দেখতাম–বললাম–দেখুন, তা নয়। আপনি তো সব বোঝেন, আপনাকে বলচি। মাঝে মাঝে আমার কেমন একটা অবস্থা হয় শরীরের ও মনের, সেটা বলে বোঝাতে পারি নে–কিন্তু তখন এমন সব জিনিস দেখি, সহজ অবস্থায় তা দেখা যায় না। ছেলেবেলায় আরও অনেক দেখতুম, এখন কমে গিয়েছে। তখন বুঝতাম না, মনে ভয় হ’ত, ভাবতাম এ-সব মিথ্যে, আমার বুঝি কি রোগ হয়েচে। কিন্তু এখন বুঝেচি ওর মধ্যে সত্যি আছে অনেক।
মেজবাবু কৌতুক ও বিদ্রূপ মিশ্রিত হাসি-মুখে আমার কথা শুনছিলেন–কথা শেষ হলে তিনি কুঞ্জ নায়েবের দিকে চেয়ে হাসলেন। নবীন মুহুরীর দিকে চাইলেন না, কারণ সে অনেক কম দরের মানুষ। স্টেটের নায়েবের সঙ্গে তবুও দৃষ্টি-বিনিময় করা চলে। আমার দিকে চেয়ে বললেন–কতদূর পড়াশুনা করেচ তুমি?
–আই-এ পাস করেছিলাম শ্রীরামপুর কলেজ থেকে–
–তাহলে তোমায় বোঝানো আমার মুশকিল হবে। মোটের ওপর ও-সব কিছু না। নিউরোটিক যারা–নিউরোটিক বোঝ? যাদের স্নায়ু দুর্বল তাদের ওই রকম হয়। রোগই বইকি, ও এক রকম রোগ–
আমি বললাম–মিথ্যে নয় যে তা আমি জানি। আমি নিজের জীবনে অনেকবার দেখেচি–ও-সব সত্যি হয়েছে। তবে কেন হয় এইটেই জানি নে, সেইজন্যেই আপনাকে জিজ্ঞেস করছি। আমি সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসির লাইক-এ পড়েচি, তিনিও এ-রকম দেখতেন–
মেজবাবু ব্যঙ্গের সুরে বললেন–তুমি ‘তাহলে’—তুমি সেন্ট হয়ে গিয়ে দেখচি? পাগল কি আর গাছে ফলে?
নবীন ও কুঞ্জ দুজনেই মেজবাবুর প্রতি সম্ভ্রম বজায় রেখে মুখে কাপড় চাপা দিয়ে হাসতে লাগল।
আমি নানাদিক থেকে খোঁচা খেয়ে মরীয়া হয়ে উঠলাম। বললাম–আর শুধু ওই দেখি যে তা নয়, অনেক সময় মরে গিয়েছে এমন মানুষের আত্মার সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের দেখতে পেয়েছি।
নবীন মুহুরীর বুদ্ধিহীন মুখে একটা অদ্ভুত ধরনের অবিশ্বাস ও ব্যঙ্গের ছাপ ফুটে উঠল, কিন্তু নিজের বুদ্ধির ওপর তার বোধ হয় বিশেষ আস্থা না থাকাতে সে মেজবাবুর মুখের দিকে চাইলে। মেজবাবু এমন ভাব দেখালেন যে, এ বদ্ধ উন্মাদের সঙ্গে আর কথা বলে লাভ কি আছে! তিনি কুঞ্জ নায়েবের দিকে এভাবে চাইলেন যে, একে আর এখানে কেন? পাগলামি চড়ে বসলেই একটা কি করে ফেলবে এক্ষুনি!
আমি আরও মরীয়া হয়ে বললাম–আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন তাতে যে-জিনিস সত্যি তা মিথ্যে হয়ে যাবে না। আমার মনে হয়, আপনি আমার কথা বুঝতেও পারেননি। যার নিজের অভিজ্ঞতা না হয়েছে, সে এ-সব বুঝতে পারবে না, এ-কথা এতদিনে আমি বুঝেচি। খুব বেশী লেখাপড়া শিখলেই বা খুব বুদ্ধি থাকলেই যে বোঝা যায় তা নয়। আচ্ছা, একটা কথা আপনাকে বলি, আমি যে ঘরটাতে থাকি, ওর ওপাশে যে ছোট্ট বাড়িটা আছে, ভাঙা রোয়াক যার সামনে–ওখানে আমি একজন বড়োমানুষের অস্তিত্ব অনুভব করতে পেরেছি–কি করে পেরেছি, সে আমি নিজেই জানি নে–খুব তামাক খেতেন, বয়স অনেক হয়েছিল, খুব রাগী লোক ছিলেন, তিনি মারা গিয়েচেন কি বেঁচে আছেন তা আমি জানি নে। ওই জায়গাটায় গেলেই এই ধরনের লোকের কথা আমার মনে হয়। বলুন তো ওখানে কেউ ছিলেন এ-রকম?
কুঞ্জ নায়েবের সঙ্গে মেজবাবুর অর্থসূচক দৃষ্টি বিনিময় হ’ল। মেজবাবু শ্লেষের সঙ্গে বললেন–তোমাকে যতটা সিম্পল ভেবেছিলাম তুমি তা নও দেখচি। তোমার মধ্যে ভণ্ডামিও বেশ আছে–তুমি বলতে চাও তুমি এত দিন এখানে এসেচ, তুমি কারও কাছে শোননি ওখানে কে থাকতো?
–আপনি বিশ্বাস করুন, আমি তা শুনিনি। কে আমায় বলেচে আপনি খোঁজ নিন?
—ওখানে আমাদের আগেকার নায়েব ছিল, ওটা তার কোয়ার্টার ছিল, সে বছর-চারেক আগে মারা গিয়েছে, শোননি এ-কথা?
–না আমি শুনিনি। আরও কথা বলি শুনুন, আপনার ছেলে হওয়ার আগের দিন কলকাতায় আপিসে আপনাকে কি বলেছিলুম মনে আছে? বলেছিলুম একটা খোকা দাঁড়িয়ে আছে–দরজা খুলে মেজবৌরাণী এসে তাকে নিয়ে গেলেন–এ-কথা বলেছিলুম কিনা? মনে করে দেখুন।
–হ্যাঁ আমার খুব মনে আছে। সেও তুমি জানতে না যে আমার স্ত্রী আসন্ন-প্রসবা ছিল? যদি আমি বলি তুমি একটা বেশ চাল চেলেছিলে–যে কোনো একটি সন্তান তো হ’তই– তুমি অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছিলে, দৈবাৎ লেগে গিয়েছিল। শার্লাটানরা ও-রকম বুজরুকি করে–আমি কি বিশ্বাস করি ওসব ভেবেচ?
–বুজরুকি কিসের বলুন? আমি কি তার জন্যে আপনার কাছে কিছু চেয়েছিলুম? বা আর কোনোদিন সে-কথার কোনো উল্লেখ করেছিলুম? আমি জানি আমার এ একটা ক্ষমতা–ছেলেবেলায় দার্জিলিঙের চা-বাগানে আমরা ছিলাম, তখন থেকে আমার এ ক্ষমতা আছে। কিন্তু এ দেখিয়ে আমি কখনও টাকা রোজগারের চেষ্টা তো করিনি কারোর কাছে? বরং বলিই নে–
মেজবাবু অসহিষ্ণুভাবে বললেন–অল ফিডলস্ট্রিক–মনের ব্যাপার তুমি কিছু জানো না। তোমাকে বোঝাবার উপায়ও আমার নেই। ইট প্লেজ কুইয়ার ট্রিকস উইথ আস– যদি ধরে নিই তুমি মিথ্যাবাদী নও–ইউ মে বি এ সেলফ ডিলিউডেড ফুল এবং আমার মনে হয় তুমি তাই-ই। আর কিছু নয়। যাও এখন–
