আমি এসেছি শুনে মতিলালের স্ত্রী দুপুরে খেতে বললে। আমায় দেখে বললে–এস বাবা, তুমি নিতাইয়ের ভাই? তুমিও মাসীমা বলে ডেকো। কাছে দাঁড়িয়ে থেকে মাসীমা দাদাকে রান্না দেখিয়ে দিতে লাগল, কারণ আমরা খেতে চাইলেও ওরা রেঁধে আমাদের খেতে দেবে কেন?
মাসীমা সংসারে নিতান্ত একা। মতিলালের ও-পক্ষের ছেলেমেয়েরা বাপের তৃতীয় পক্ষের পরিবারকে দু-চোখ পেড়ে দেখতে পারে না, বা এখানে থাকেও না কেউ। অথচ মাসীমার ইচ্ছে তাদের নিয়ে মিলেমিশে সংসার করা। আমরা খেতে বসলে কত দুঃখ করতে লাগল।
–এই দ্যাখো বাবা, কেষ্টকে বলি বৌমাকে নিয়ে এখানে এস, এসে দিব্যি থাক। বৌমাটি বড় চমৎকার হয়েছে। তা যদি আসে! সেই নিয়ে রেখেচে শ্বশুরবাড়ি, কালনার কাছে দাঁইহাট–সেখানেই থাকে। আমার নিজের পেটে তো হ’ল না কিছু, ওরাই আমার সব–তা এমুখো হয় না কেউ। বড় মেয়ে দুটি শ্বশুরবাড়ি আছে, আনতে পাঠালে বলে, সৎমায়ের আর অত আত্যিসূয়ো দেখাতে হবে না। শোন কথা। আমায় মা বলে কেউ ডাকেও না। ডাকলে তাদের মান যাবে।
মাসীমাকে খুশী করবার জন্যে আমি কারণে-অকারণে খুব মাসীমা মাসীমা বলে ডাকতে লাগলাম। আমাদের পাতে আবার মাসীমা খেতে বসলেন, বললেন- ব্রাহ্মণের পেরসাদ পাবো, ওতে কি আর ছোট বড় আছে বাবা?
আমার মনে অস্বস্তি হ’ল আমি তো এঁদের এসব মানিনে, ব্রাহ্মণের ধর্ম পালন করিনে, সে কথা তো ইনি জানেন না। অথচ খুলে বললে মাসীমার মনে কষ্ট দেওয়া হবে হয়ত।
দাদার কাছ থেকে আটঘরায় এলাম। আসবার সময় সীতার জন্যে ভাল সাবান কিনে নিয়ে এলাম, বই পড়তে ভালবাসে ব’লে দু-তিনখানা বাংলা বইও আনলাম। সীতা বড় হয়ে উঠেচে–মাথায় খুব লম্বা হয়েচে, দেখতে সুন্দর হয়েছে আরও।
আমার হাত থেকে সাবান নিয়ে হেসে বললে–দেখি দাদা কেমন সাবান…আমার একখানাও আস্ত সাবান ছিল না। একখানা সানলাইট সাবান আনিয়েছিলুম বাজার থেকে–সে আধখানা হয়ে গিয়েছে।
সীতার সে পুরোনো অভ্যাস এখনও আছে, কথা বলতে বলতে হঠাৎ খোঁপায় হাত দিয়ে দেখে ঠিক আছে কি-না। লম্বা ঢেঙা, চওড়া নক্সা-পাড় কাপড় পরনে, খোঁপার ধরনও আজকাল শহরে দেখে এসেচি ও-রকম খোঁপা উঠে গিয়েচে। ও-ধরনের কাপড় পরলে সেখানে লোকে হাসবে, বেচারী সীতা! লেখাপড়া শেখবার, বই পড়বার ওর কত আগ্রহ! অথচ এই পাড়াগাঁয়ে পরের বাড়ি দাসীবৃত্তি করেই ওর জীবন কাটল। না হ’ল লেখাপড়া শেখা, না মিটল কোনো সাধ। অথচ ওর বুদ্ধি ছিল এত চমৎকার, মিশনারী মেমেরা কত প্রশংসা করত, ওকে কি ভালই বাসত মিস নর্টন। কিন্তু কি হ’ল ওর? এখনও সেই কতকাল আগেকার পুরোনো বইগুলোই পড়চে, কিছুই শেখেনি, কিছুই দেখেনি।
সীতা বললে–দাদা পাস করেচ?
—পাসের খবর এখনও বেরোয়নি। পাস করবো ঠিকই।
—পাস হ’লে আমায় জানিও দাদা। আমি তোমাকে একটা জিনিস প্রাইজ দেবো!
—কি জিনিস রে?
–একটা মনিব্যাগ বুনচি লাল উলের। তোমার জন্যে একটা, বড়দার জন্যে একটা। তোমাদের নাম লিখে দেবো। মিস নর্টন আমাদের দিত কত কি প্রাইজ–না?
–মিস নর্টনকে তোর মনে আছে সীতা? তুই তো তখন খুব ছোট।
–খুব মনে আছে, তার দেওয়া জিনিস আমার বাক্সে এখনও রয়েছে। দেখলেই তাদের কথা মনে পড়ে।
জ্যাঠামশায় আমাকে ডেকে বললেন–জিতু শোনো। এখন তুমি বড় হয়েচ, তোমার সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করাই ভাল। সীতার বিয়ে না দিলে নয়। ওর পনের-ষোল বছর হ’ল, আর ঘরে রাখা যায় না। কিন্তু এদিকে টাকাকড়ি খরচ করবে কে? হাজার টাকার কমে আজকাল ভদ্রলাকের ঘরের বিয়ের কথাই তোলা যায় না। দেখে এসেচ তো শহর বাজারে? তা আমি এক জায়গায় ঠিক করেচি পাত্রটির বাপ আমার এখানে এসেছিল। জমিজমা আছে, চাষা গেরস্ত, খেতে পরতে কষ্ট পাবে না। আখের চাষই আছে অমন বিশ-বাইশ বিঘে। পাত্রটি চাষবাস দেখে, রং একটু কালো–তা হোক, পুরুষ মানুষের রঙে কি আসে যায়, তবে বংশ ভাল, কামদেব পণ্ডিতের সন্তান, সবে তিন পুরুষে ভঙ্গ, আমাদেরই স্বঘর।
আমি বললাম–লেখাপড়া কতদূর করেচে?
–লেখাপড়া কি আর এম-এ, বি-এ পাস করেছে? তবে বাংলা ছাত্রবৃত্তি পর্যন্ত পড়েছে, দিব্যি হাতের লেখা। হ্যাঁ, একটা কথা ভুলে যাচ্ছি,–অল্পদিন হ’ল পাত্রটির প্রথম পক্ষের স্ত্রী মারা গিয়েছে–তবে সে কিছু নয়, বয়েস কমই। একটি বুঝি ছেলে আছে ও-পক্ষের।
ছাত্রবৃত্তির কথায় আমার মতিলালের উটের কবিতাটি মনে পড়ল। আমি বললাম– আচ্ছা আমি ভেবে বলব জ্যাঠামশাই। লেখাপড়া জানে না আর তাতে দোজবরে, এতে বিয়ে দেওয়া আমার মন সরে না। সীতার মত মেয়ে, আপনি বলুন না জ্যাঠামশাই?
জ্যাঠামশাই নিজের কথার প্রতিবাদ সহ্য করতে পারেন না–তিনি এ অঞ্চলের মানী ব্যক্তি, আগের চেয়ে বিষয়-আশয় টাকাকড়ি এখন তাঁর আরও বেশী, এদিকের সব লোক তাঁকে খাতির করে চলে, কেনই বা তিনি প্রতিবাদ সহ্য করবেন? সে জানি এ গাঁয়ের রাম বাঁড়ুয্যের ব্যাপারে। রাম বাঁড়ুয্যে কি জন্যে রাত্রে আফিম খেয়ে শুয়েছিল–সকালে উঠে খবর পেয়ে জ্যাঠামশায় গেলেন। রাম বাঁড়ুয্যে ছিল জ্যাঠামশায়ের খাতক। জ্যাঠামশায় গিয়ে কড়া সুরে বললেন–কি হয়েছে রাম? রাম বাঁড়ুয্যে তখন কথা বলতে পারছে না– জ্যাঠামশায়ের কথার উত্তর সে দিতে পারল না। জ্যাঠামশায় ভাবলেন, বাঁড়ুয্যে তাঁর প্রতি অসম্মান দেখিয়ে ইচ্ছে করেই কথার উত্তর দিচ্ছে না। বললেন–ভাল ক’রে কথার উত্তর দাও–কার সামনে কথা বলচ জান না? সঙ্গের সব লোক বললে–হাঁ, কর্তা যা বলচেন, জবাব দাও ওঁর কথার। কিন্তু রাম বাঁড়ুয্যে জ্যাঠামশায়ের চোখরাঙানির চোহদ্দি পার হয়ে চলে গেল ঘণ্টা দুইয়ের মধ্যেই–কি জন্যে সে আফিম খেয়েছিল কেউ জানে না–তার মৃত্যুর পরে জ্যাঠামশায় তার ভিট্মোটি বিক্রী করে নিয়ে নিলেন–তার বিধবা স্ত্রী নাবালক একটি মাত্র মেয়ের হাত ধরে ভাইদের দোরে গিয়ে পড়লো। আমি যেবার ম্যাট্রিক দিই, সে বছরের কথা।
