একজন বললে–আবার কি রকম ইংরিজি বলছে দ্যাখ—
আমি ও সীতা কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে আছি। আমরা কেউ কোন কথা বলচি নে।
আর একটু বেলা হলে জ্যাঠামশায় কি পরামর্শ করলেন সব লোকজনের সঙ্গে– আমার মাকে উদ্দেশ করে বললেন–বৌমা, সবই তো দেখতে পাচ্চ–তোমাদের কপাল ছাড়া আর কি বলব। ভূষণকে এখন বেঁধে রাখতে হবে–সেই মতই সবাই করেছেন। ছেলেপিলের বাড়ি-পাড়ার ভেতরকার কাণ্ড-–এরকম অবস্থায় কখন কি করে বসে, তা বলা যায় না…তা তোমায় একবার বলাটা দরকার তাই–
আমার মনে বড় কষ্ট হ’ল–বাবাকে বাঁধবে কেন? বাবা তো এক বকুনি ছাড়া আর কারুর কিছু অনিষ্ট করতে যাচ্ছেন না–কেন তবে—
আমার মনের ভাষা বাক্য খুঁজে পেলে না প্রকাশের–মনেই রয়ে গেল। বাবাকে সবাই মিলে বাঁধলে! আহা, কি কষে কষেই বাঁধলে। অন্য দড়ি কোথাও পাওয়া গেল না বা ছিল না–জ্যাঠামশায়দের খিড়কি-পুকুর ধারের গোয়াল-বাড়ি থেকে গরু বাঁধবার দড়ি নিয়ে এল–তাই দিয়ে বাঁধা হ’ল।
আমার মনে হ’ল অতটা জোর করে বাবাকে বাঁধবার দরকার কি! বাবার হাতের শির দড়ির মতো ফুলে উঠেছে যে। সেজ কাকাকে চুপিচুপি বললুম–কাকাবাবু, বাবার হাতে লাগছে, অত করে বেঁধেচে কেন? বলুন না ওদের?
কাকা সে-কথা জ্যাঠামশায়কে ও নিতাইয়ের বাবাকে বলতে তাঁরা বললেন–তুমিও কি খেপলে নাকি রমেশ? হাত আলগা থাকবে পাগলের?…তা হলে পা খুলতে কতক্ষণ– তারপরে আমার দিকে চেয়ে জ্যাঠামশায় বললেন–যাও জিতু বাবা–তুমি বাড়ির ভেতরে যাও–নয়তো এখন বাইরে গিয়ে বসো।
আবার বাবার হাতের দিকে চেয়ে দেখলুম–দড়ির দাগ কেটে বসে গিয়েছে বাবার হাতে। সেই রকম তুলোমাখা অদ্ভুত মূর্তি!…
বাইরে গিয়ে আমি একা গাঁয়ের পেছনের মাঠের দিকে চলে গেলুম–একটা বড় তেঁতুল গাছের তলায় সারা দুপুর ও বিকেল চুপ করে বসে রইলুম।
দিন কতক এই ভাবে কাটল। তারপর পাড়ার দু-পাঁচজন লোকে এসে জ্যাঠামশায়ের সঙ্গে কি পরামর্শ করলে। বাবাকে কোথায় তারা নিয়ে গেল, সবাই বললে কলকাতায় হাসপাতালে নিয়ে গেছে। তারা ফিরেও এল, শুনলুম, বাবাকে নাকি হাসপাতালে ভর্তি করে নিয়েছে। শীগগিরই সেরে বাড়ি ফিরবেন। আমরা আশ্বস্ত হলুম।
দশ-বারো দিন পরে একদিন বিকেলের দিকে আমি ও সীতা পথে খেলা করছি, এমন সময় সীতা বললে–ঐ যে বাবা!…দূরে পথের দিকে চেয়ে দেখি বাবাই বটে। ছুটে আমরা বাড়িতে মাকে খবর দিতে গেলুম। একটু পরে বাবা বাড়ি ঢুকলেন–এক হাঁটু ধুলো, রুক্ষ চুল। ওপর থেকে জ্যাঠাইমা নেমে এলেন, কাকারা এলেন। বাবাকে দেখে সবাই চটে গেলেন। সবাই বুঝতে পারলে বাবা এখনও সারেন নি, তবে সেখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসার কি দরকার?
বাবা একটু বসে থেকে বললেন, ভাত আছে? কাল ওই দিকের একটা গাঁয়ে দুপুরে দুটো খেতে দিয়েছিল, আর কিছু খাই নি সারাদিন, খিদে পেয়েছে। কলকাতা থেকে পায়ে হেঁটে আসচি-ছেলেপিলে ছেড়ে থাকতে পারলাম না–চলে এলাম।
একটু পরেই বোঝা গেল বাবা হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসেছেন এবং যেমন পাগল তেমনি আছেন। এবার আমাদের রাগ হ’ল–মায়ের কথা বলতে পারিনে কারণ তাঁকে রাগ প্রকাশ করতে কখনও দেখি নি–কিন্তু আমি সীতা দাদা তিন ভাইবোনে খুব চটলাম।
আমাদের চটবার কারণও আছে–খুব সঙ্গত কারণই আছে। আমাদের প্রাণ এখানে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। বাবা আবার পুরোমাত্রায় পাগল হয়ে উঠলেন–তিনি দিনরাত বসে বসে বকেন আর কেবল খেতে চান। মা দুটি বাসি মুড়ি, কোনো দিন বা ভিজেচাল, কোনো দিন শুধু একটু গুড়–এই খেতে দেন। তাও সব দিন বা সব সময় জোটানো কষ্টকর। আমরা দুপুরে খাই তো রাতে আর কিছু খেতে পাইনে–নয়ত সারাদিন পরে হয়ত সন্ধ্যার সময় খাই। মা কোথা থেকে চাল যোগাড় করে আনেন আমরা জানিনে– কখনও জিজ্ঞেসও করিনি। কিন্তু বাড়িতে আর আমাদের তিষ্ঠুবার জো নেই। বাড়িসুদ্ধ লোক আমাদের ওপর বিরূপ–দু-বেলা তাদের অনাদর আর মুখনাড়া সহ্য করা আমাদের অসহ্য হয়ে উঠেছে। চা-বাগানের দিনগুলোর কথা মনে হয়, সেখানে আমাদের কোন কষ্ট ছিল না–অবস্থা ছিল অত্যন্ত সচ্ছল, ছেলেবেলায় সীতাকে ভুটিয়া চাকরে নিয়ে বেড়াত আর থাপা মানুষ করেছিল আমাদের। ছ-বছর বয়স পর্যন্ত আমি থাপার কাঁধে উঠে বেড়াতাম মনে আছে। আমাদের এই বর্তমান দুরবস্থার জন্য বাবাকে আমরা মনে মনে দায়ী করেছি। বাবা কেন আবার ভাল হয়ে সেরে উঠুন না? তা হলে আর আমাদের কোনো দুঃখই থাকে না। কেন বাবা ওরকম পাগলামি করেন? ওতে লজ্জায় যে ঘরে বাইরে আমাদের মুখ দেখাবার জো নেই।
সেদিন সকালে সেজ খুড়ীমা এসে আমাদের সঙ্গে খুব ঝগড়া বাধালেন। মেজ খুড়ীমাও এসে যোগ দিলেন। তাঁদের বাগানে বাতাবী নেবু গাছ থেকে চার-পাঁচটা পাকা নেবু চুরি গিয়েছে। খুড়ীমা এসে মাকে বললেন–এ আমাদেরই কাজ–আমরা খেতে পাইনে, আমরাই নেবু চুরি করে ঘরে রেখেছি। তাঁরা সবাই মিলে আমাদের ঘর খানাতল্লাসী করতে চাইলেন। মা বললেন–এসে দেখে যান মেজদি, আমার ঘরে তো লোহার সিন্দুক নেই যে সেখানে আমার ছেলেমেয়েরা নেবু লুকিয়ে রেখেছে…এসে দেখুন—
শেষ পর্যন্ত বাবা ঘরে আছেন বলে তাঁরা ঘরে ঢুকতে পারলেন না, কিন্তু সবাই ধরে নিলে যে নেবু আমাদের ঘরে আছে, খানাতল্লাসী করলেই বেড়িয়ে পড়ত। খুব ঝগড়াঝাঁটি হ’ল–তবে সেটা হ’ল একতরফা, কারণ এ-পক্ষ থেকে তার জবাব কেউ দিল না।
