অনুমতি নিয়ে আসতে আধঘণ্টা কেটে গেল, তারপর বিমল আর এ্যালিস কনসেশনের বড়ো ফটক দিয়ে সাংহাইয়ে যাবার রাস্তার ওপরে উঠে একখানা রিকশা ভাড়া করলে।
কনসেশনে রাস্তাঘাটের নাম ইংরাজিতে ও ফরাসি ভাষায়। সাংহাই শহরে চীনা ভাষায়। কিছু বোঝা যায় না। ঢলঢলে নীল ইজের ও স্ট্র হ্যাট পরে চীনা রিকশাওয়ালা রিকশা টানছে কিন্তু এ অংশেও বহু বিদেশি লোক ও বিদেশি দোকান পসারের সারি। সাংহাই-এর আসল চীনাপল্লি আলাদা–রাস্তা সেখানে আরও সরু সরু–একথা বিমল ইতিমধ্যে চীনা অফিসারদের মধ্যে শুনেছিল।
এ্যালিস বললে–চলো, চীনাপাড়া দেখে আসি, মি. বোস।
রিকশাওয়ালাকে চীনাপাড়ার কথা বলতেই সে বারণ করলে। বললে– সেখানে কেন যাবে। এ সময় সেসব জায়গা ভালো না। বিপদে পড়তে পার। তোমাদের সেখানে নিয়ে গেলে আমায় পুলিশে ধরবে।
এ্যালিস ভয় পাবার মেয়েই নয়। বললে–চলো, মি. বোস, আমরা হেঁটেই যাব। ওকে বিপদে ফেলতে চাই নে। ওর ভাড়া মিটিয়ে দিই।
বিমল রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে দিলে, এ্যালিসকে দিতে দিলে না। কিন্তু রাস্তা দু-জনে কেউই জানে না।
বিমল বললে–একখানা ট্যাক্সি নিই, এ্যালিস! সে অনেকদূর, রাস্তা না জানলে ঘুরে হয়রান হব।
হঠাৎ এ্যালিস ওপরের দিকে চেয়ে বললে–ও কি ও, মি. বোস? এরোপ্লেনের শব্দ শুনছ? অনেকগুলো এরোপ্লেন একসঙ্গে আসছে যেন। কোনদিকে বলো তো?
বিমলও শুনলে। বললে–গভর্নমেন্টের এরোপ্লেন।
কিন্তু চক্ষের নিমেষে একটা কান্ডের সূত্রপাত হল, যা বিমলের অভিজ্ঞতার বাইরে।
সামনে একটা প্রকান্ড বাড়ির ওপর বিকট এক আওয়াজ হল–বাজপড়ার আওয়াজের মতো–সঙ্গেসঙ্গে এদিকে-ওদিকে, সামনে-পেছনে পরপর সেইরকম ভীষণ আওয়াজ। ইট, চুন, টালি চারিদিকে ছুটতে লাগাল। বিরাট শব্দ করে সামনে সেই বাড়িটার তেতলার ছাদ ধসে পড়ল ফুটপাথের ওপর। বাড়িধসা চুন সুরকির ধুলোয় ও কীসের ঘন শ্বাসরোধকারী ধোঁয়ায় বিমল ও এ্যালিসকে ঘিরে ফেললে।
সঙ্গে সঙ্গে উঠল মানুষের গলার আর্ত চিৎকার, গোলমাল, গোঙানি, কাতর কাকুতি অনুনয়ের শব্দ, দুড়দাড় শব্দে ছুটে চলার পায়ের শব্দ, কান্নার শব্দ, সে এক ভয়ানক কান্ড!
বিমল প্রথমটা বুঝতে না পেরে সেই ঘন ধূম আর ধূলির মধ্যে হতভম্বের মতো খানিক দাঁড়িয়ে রইল–ব্যাপার কী? তারপরেই বিদ্যুৎ চমকের মতো তার মনে হল এ জাপানি এরোপ্লেনের বোমা বর্ষণ!
এ্যালিস কই? একহাতের দূরের মানুষ চোখে পড়ে না, সেই ধোঁয়া ধুলো আর গোলমালের মধ্যে। ওর কানে গেল এ্যালিসের উচ্চ ও সশঙ্ক কণ্ঠস্বর–মি. বোস, এসো–আমার হাত ধরো–বোমা পড়ছে–দৌড় দাও!
অন্ধকারের মধ্যে বিমল এ্যালিসের হাত শক্ত মুঠোয় ধরে বললে– কোথাও নোড়ো না এ্যালিস, নড়লেই মারা যাবে। দাঁড়াও এখানে।
কিন্তু তখন আর ছোটবার বা পালাবার পথও নেই। পরবর্তী পাঁচ মিনিট কালের ঠিক হিসেব বিমল দিতে পারবে না। সে নিজেও জানে না। বাঁশঝাড়ে আগুন লাগলে যেমন গাঁটওয়ালা বাঁশ ফটফট করে একটার পর একটা ফাটে তেমনি চারিদিকে দুমদাম শুধু বোমা ফাটার বিকট আওয়াজ।
পায়ের তলায় মাটি যেন দুলছে, টলছে ভূমিকম্পের মতো ধোঁয়া, বাড়ি ধসে পড়ার হুড়মুড় শব্দ, আর্তনাদ–তারপরে সব চুপচাপ, বোমার আওয়াজ থেমে গেল। বিমল চেয়ে দেখলে এরোপ্লেনগুলো মাথার ওপরে চক্রাকারে দু-বার ঘুরে যেদিক দিয়ে এসেছিল সেদিকে চলে গেল–বেশ যেন নিরুপদ্রব, শান্ত ভাবেই।
ধোঁয়ায় মিনিট দুই তিন কিছু দেখা গেল না–যদিও গোলমাল, চিৎকার লোক জড়ো হওয়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশের তীব্র হুইসল বেজে উঠল একবার–দু-বার, তিনবার।
ক্রমে ক্রমে ধুলো আর ধোঁয়ার আবরণ কেটে যেতেই এ্যালিস বললে–চলো এগিয়ে গিয়ে দেখি, মি. বোস—
সামনে একজায়গায় ফুটপাথের ওপর বেজায় লোক জড়ো হয়েছে। একটা বাড়ি পড়েছে ভেঙে। অতি বীভৎস দৃশ্য ফুটপাথের ওপর। অনেকগুলি ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ের ছিন্ন ভিন্ন দেহ ছিটকে ছড়িয়ে পড়ে আছে সেখানটায়! বাড়িটা বোধ হয় একটা চীনা স্কুল ছিল– বেলা এগারোটা, ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছিল, কতক ছিল স্কুলবাড়ির মধ্যে। বাড়িখানা একেবারে হুমড়ি খেয়ে ভেঙে পড়েছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ফুটপাথ ও রাস্তার খানিকদূর পর্যন্ত।
হর্ন বাজিয়ে দু-খানা রেডক্রশ অ্যাম্বুলেন্স এল! একটা ছোটো ছেলে এখনও নড়ছে– এ্যালিস ছুটে তার পাশে গিয়ে বসল। বিমল এক চমক দেখেই বললে– কোনো আশা নেই মিস হুইটবার্ন–ও এখুনি যাবে।
বিমলের গা তখনও কাঁপছে। জীবনে এ-রকম দৃশ্য কখনো দেখবার কল্পনাও সে করেনি। যুদ্ধ না শিশুপাল বধ!
এ্যালিস-বিমলের কাজ অনেক সংক্ষেপে হয়ে গিয়েছিল।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আহত কেউ ছিল না–সবাই মৃত।
সব শেষ হয়ে যাবার পরে বিমল বললে–এ্যালিস, এখন কী করবে? আর কি চীনে পল্লিতে যাবে এখন?
এ্যালিস বললে–যেতাম কিন্তু এই যে বোমা ফেলা হয়ে গেল, এর শোরগোল অনেকদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে তো। কনসেশনের সবাই আমাদের জন্যে চিন্তিত হয়ে পড়বে। সুতরাং চলো ফেরা যাক। কিছুদূরে যেতেই দেখলে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ছুটোছুটি করছে। চীনা গভর্নমেন্টের অ্যান্টি-এয়ারক্র্যাফট কামানগুলি চারদিক থেকে ছোঁড়া হতে লাগল–কিন্তু তখন জাপানি বিমান কোথায়? আকাশের কোনো দিকেই তার পাত্তা নেই।
