তা নয়। ঔপনিবেশিক ভারতীয়দের নিজেদের হাতে পোঁতা গাছের চারা এগুলো। বড়ো গাছগুলির থেকে বীজ পড়ে পড়ে এগুলি জন্মেছে। এ গাছ অধস্তন চতুর্থ বা পঞ্চম পুরুষ আসল গাছের।
সেদিনই সন্ধ্যার কিছু পূর্বে সনৎ বনের মধ্যে এক জায়গায় একটা কৃষ্ণ-প্রস্তরমূর্তি দেখে চিৎকার করে সবাইকে এসে খবর দিলে। ওরা ছুটতে ছুটতে গিয়ে দেখলে গভীর জঙ্গলের লতাপাতার মধ্যে একটা ভাঙা পাষাণমূর্তি–মূর্তির মুন্ডু নেই, তবে হাত-পা দেখে মন হয় শিবমূর্তি ছিল সেটা, দু-হাত উঁচু প্রস্তর-বেদির ওপর মূর্তিটা বসানো, এক হাতে বরাভয়, অন্য হাতে ডমরু, গলায় অক্ষমালা–এত দূর দেশে এসে ভারতীয় সংস্কৃতির এই চিহ্ন দেখে সুশীল ও সনৎ বিস্ময়ে ও আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়ল–সেখান থেকে যেন সরে যেতে পারে না। এই দুস্তর সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে তাদের পূর্বপুরুষেরা হিন্দুধর্মের বাণী বহন করে এনেছিল একদিন এদেশে। সুলু সমুদ্রের ওই ডুবো পাহাড় অতিক্রম করতে চীনা জাঙ্কওয়ালা যে কৌশল দেখালে, এই কম্পাস ও ব্যারোমিটারের যুগের বহু বহু পূর্বে তাদের পূর্বপুরুষেরা সে-কৌশল একদিন না যদি দেখাতে পারতেন–তবে নিশ্চয়ই এ দ্বীপে পদার্পণ তাদের পক্ষে সম্ভব হত না। মনে মনে সুশীল তাঁদের প্রণতি জানালে। নমো নমঃ দিগবিজয়ী পূর্বপুরুষগণ, আশীর্বাদ করো–যে বল ও তেজ তোমাদের বাহুতে, যে দুর্ধর্ষ অনমনীয়তা ছিল তোমাদের মনে, আজ তোমার অধঃপতিত দুর্বল উত্তরপুরুষেরা যেন সেই-বল ও তেজের আদর্শে আবার নিজেদের গড়ে তুলতে পারে, সার্থক করতে পারে ভারতের নাম বিশ্বের দরবারে।
জামাতুল্লা ও ইয়ার হোসেনও চমৎকৃত হল। এ বনেও একদিন মানুষ ছিল তাহলে! এই যে গভীর বন আজ শুধু অজগর আর ওরাং ওটাংয়ের বিচরণক্ষেত্র, এখানে একদিন সভ্য মানুষের পদশব্দ ধ্বনিত হয়েছে, মন্দির গড়েছে, মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছে–এ-ই সকলের চেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার বলে মনে হল এদের কাছে।
জামাতুল্লাকে সুশীল বললে–কেমন, এসব দেখেছিলে বলে মনে হয়?
এসব দেখিনি। তবে এতে বোঝা যাচ্ছে মানুষের বাসের নিকটে এসে পড়েছি।
সে জায়গাটা কেমন?
সে একটা শহর বাবুজি। তার বাইরে পাঁচিল ছিল একসময়ে। এখন পড়ে গিয়েছে।
কম্পাস দেখে দিক ঠিক করেছিলে? ল্যাটিচিউড লঙ্গিচিউড ঠিক করেছিলে?
না বাবুজি, ওসব কিছু করিনি। কম্পাস ছিল না।
সকলের মনে আশার সঞ্চার হল যে এবার নিশ্চয়ই সেই প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষের কাছাকাছি আসা গিয়েছে। কিন্তু তারপর তিনদিন কেটে গেল, চারদিন গেল, পাঁচদিন গেল– আবার সামনে সমুদ্রের পূর্ব তীর, আবার সুনীল সুলু সি। কোথায় নগর, কোথায়ই-বা কী। একখানা ইট বা পাথরও জঙ্গলের মধ্যে কোথাও কারো চোখে পড়ল না আর। আবার হতাশ হয়ে পড়ল সকলে। জামাতুল্লাকে ইয়ার হোসেন বললে–জামাতুল্লা সাহেব, স্বপ্ন দেখনি তো হিন্দু-মন্দিরের আর শহরের? জামাতুল্লা গেল রেগে। ইয়ার হোসেনের অনুচরেরা নিজেদের মধ্যে কী বিড়বিড় করতে লাগল।
সুশীল সনৎ ও জামাতুল্লাকে গোপনে ডেকে বললে–ইয়ার হোসেনের ওই লোকগুলোকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে যদি কিছু চিহ্ন না পাওয়া যায়– দেখছি ওগুলো ভারি বদমাইশ!
জামাতুল্লা বললে–ভাববেন না বাবুজি, আমি ছুরি চালাব, আপনাদের জন্যে প্রাণ দেব! ওরা কী করবে? কাঠের ভেলা তৈরি করে সুলু সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নিয়ে যাব–ওই হলদেমুখো চীনে জাঙ্কওয়ালা বড়ো বাহাদুরি করে গেল আপনাদের কাছে–দেখব ও কত বাহাদুর!
একদিন সন্ধ্যার ঘণ্টাখানেক আগে সুশীল বনের মধ্যে পাখি শিকার করতে বেরোলো বন্দুক নিয়ে। কিছুদূর জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে সে অস্পষ্ট গোধূলির আলোয় দূর থেকে একটা লম্বা পাহাড়-মতো দেখতে পেলে। আরও কাছে গিয়ে সে দেখলে পাহাড় ও তার মধ্যে একটা খাল, তাতে জল আছে–গভীর খাল। জলে পদ্মফুল ফুটে রয়েছে। ভালো করে চেয়ে দেখে সে বুঝলে ওপারে ওটা পাহাড় নয়, একটা উঁচু পাঁচিল হতে পারে ওটা। খাল নয়, মানুষের হাতে কাটা পরিখা হয়তো। পাঁচিলের ওপর বড়ো বড়ো গাছ গজিয়েছে, মোটা মোটা শেকড় পাঁচিলের গা বেয়ে এসে মাটিতে নেমেছে–তাদের ডালপালার ফাঁক দিয়ে জায়গায় জায়গায় পাঁচিলের গায়ের বড়ো-বড়ো পাথরের চাঁইগুলি দেখা যাচ্ছে।
সুশীল আনন্দে ও বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল।
এই তবে সেই প্রাচীন নগরীর প্রাচীন ও পরিখা। এ বিষয়ে ভুল থাকতে পারে না–তবে, হয়তো সে উলটো দিক থেকে এটাকে দেখছে। নগরীর সিংহদ্বার অন্য দিকে আছে কোথাও।
সে যখন সকলকে গিয়ে খবর দিল তখন সন্ধ্যার অন্ধকার সমগ্র বনভূমিকে আচ্ছন্ন করেছে। ইতিমধ্যেই ওরাংওটাং ও শৃগালের ডাক শোনা যাচ্ছে। দু-একটা নিশাচর পাখি ছাড়া অন্য পাখির কূজন থেমে গিয়েছে। ডালপালার ফাঁকে ঊর্ধ্বে কৃষ্ণ আকাশে নক্ষত্রাদি দেখা দিয়েছে।
ইয়ার হোসেন বারণ করলে–এখন না, এ রাত্রিকালে তাঁবু ছেড়ে কোথাও যেও না, কাল সকালে দেখা যাবে।
সুশীলের আনা পাখি দিয়ে তাঁবুতে ভোজ হল রাত্রে।
জামাতুল্লা বললে–পাঁচিল যখন বেরিয়েছে–তখন আমায় মিথ্যেবাদী বলে বদনাম আর কেউ দিতে পারবে না। পরদিন সকলে গিয়ে দেখলে, সত্যই বিরাট প্রাচীর ও পরিখার অস্তিত্ব, ওদের সেখানে কোনো প্রাচীন নগরীর অস্তিত্বের নিদর্শনস্বরূপ বিরাজমান।
