6- Tod’s Rajasthan –Vol. I, page 381.
রাজসিংহ – ৬.১
ষষ্ঠ খণ্ড
অগ্নির উৎপাদন
প্রথম পরিচ্ছেদ : অরণিকাষ্ঠ–উর্বশী
রাজসিংহ যে তীব্রঘাতী পত্র ঔরঙ্গজেবকে লিখিয়াছিলেন, তৎপ্রেরণ হইতে এই অগ্ন্যুৎপাদন খণ্ড আরম্ভ করিতে হইবে। সেই পত্র ঔরঙ্গজেবের কাছে কে লইয়া যাইবে, তাহার মীমাংসা কঠিন হইল। কেন না, যদিও দূত অবধ্য, তথাপি পাপে কুণ্ঠাশূন্য ঔরঙ্গজেব অনেক দূত বধ করিয়াছিলেন ইহা প্রসিদ্ধ। অতএব প্রাণের শঙ্কা রাখে, অন্তত: এমন সুচতুর নয় যে, আপনার প্রাণ বাঁচাইতে পারে, এমন লোককে পাঠাইতে রাজসিংহ ইচ্ছুক হইলেন না। তখন মাণিকলাল আসিয়া প্রার্থনা করিল যে, আমাকে এই কার্যে নিযুক্ত করা হউক। রাজসিংহ উপযুক্ত পাত্র পাইয়া তাহাকেই এই কার্যে নিযুক্ত করিলেন।
এ সংবাদ শুনিয়া চঞ্চলকুমারী, নির্মলকুমারীকে ডাকিলেন। বলিলেন, “তুমিও কেন তোমার স্বামীর সঙ্গে যাও না?”
নির্মল বিস্মিত হইয়া বলিল, “কোথায় যাব? দিল্লী? কেন?”
চ। একবার বাদশাহের বঙমহালটা বেড়াইয়া আসিবে।
নি । শুনিয়াছি, সে না কি নরক।
চ। নরকে কি কখন তোমায় যাইতে হইবে না? তুমি গরিব বেচারা মাণিকলালের উপর যে দৌরাত্ম্য কর, তাহাতে তোমার নরক হইতে নিস্তার নাই।
নি । কেন, সুন্দর দেখে বিয়ে করেছিল কেন?
চ। সে বুঝি তোমায় গাছতলায় মরিয়া পড়িয়া থাকিতে সাধিয়াছিল?
নি । আমি ত আর তাকে ডাকি নাই। এখন সে ভূতের বোঝা বহিয়া দিল্লী গিয়া কি করিব বলিয়া দাও।
চ। উদিপুরীকে নিমন্ত্রণ-পত্র দিয়া আসিতে হইবে।
নি । কিসের?
চ। তামাকু সাজার।
নি । বটে, কথাটা মনে ছিল না। পৃথিবীশ্বরী তোমার পরিচর্যা না করিলে, তোমারও ভূতের বোঝা মিলিবে না।
চ। দূর হ পাপিষ্ঠা! আমিই এখন ভূতের বোঝা। হয়, বাদশাহের বেগম আমার দাসী হইবে–নহিলে আমাকে বিষ খাইতে হইবে। গণকের ত এই গণনা।
নি । তা, পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণ করিলেই কি বেগম আসিবে?
চ। না। আমার উদ্দেশ্য বিবাদ বাধান। আমার বিশ্বাস, বিবাদ বাধিলেই মহারাণার জয় হইবে। আর বেগম বাঁদী হইবে। আর উদ্দেশ্য, তুমি বেগমদিগকে চিনিয়া আসিবে।
নি । তা কি প্রকারে এ কাজ পারিব, বলিয়া দাও।
চ। আমি বলিয়া দিতেছি। তুমি জান যে, যোধপুরী বেগমের পাঞ্জাটা আমার কাছে আছে। সেই পাঞ্জা তুমি লইয়া যাও। তাহার গুণে তুমি রঙমহালে প্রবেশ করিতে পারিবে। এবং তাহার গুণে তুমি যোধপুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে পারিবে। তাঁহাকে সবিশেষ বৃত্তান্ত বলিবে। উদিপুরীর নামে যে পত্র দিতেছি, তাহা তাঁহাকে দেখাইবে। তিনি ঐ পত্র কোন প্রকারে, উদিপুরীর কাছে পাঠাইয়া দিবেন। যেখানে নিজের বুদ্ধিতে কুলাইবে না, সেখানে স্বামীর বুদ্ধি হইতে কিছু ধার লইও।
নি । ই:! আমি যাই মেয়ে, তাই তার সংসার চলে।
হাসিতে হাসিতে নির্মলও পত্র লইয়া চলিয়া গেল। এবং যথাকালে স্বামীর সঙ্গে, উপযুক্ত লোকজন সমভিব্যাহারে দিল্লীযাত্রার উদ্যোগ করিতে লাগিল।
রাজসিংহ – ৬.২
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : অরণিকাষ্ঠ–পুরুরবা
উদ্যোগ মাণিকলালেরই বেশী। তাহার একটা নমুনা সে একদিন নির্মলকুমারীকে দেখাইল। নির্মল সবিস্ময়ে দেখিল, তাহার কাটা আঙ্গুলের স্থানে আবার নূতন আঙ্গুল হইয়াছে। সে মাণিকলালকে জিজ্ঞাসা করিল, “এ আবার কি?”
মাণিকলাল বলিল, “গড়াইয়াছি |”
নির্মল । কিসে?
মাণিক। হাতীর দাঁতে। কলকব্জা বেমালুম লাগাইয়াছি, তাহার উপর ছাগলের পাতলা চামড়া মুড়িয়া আমার গায়ের মত রঙ করিয়াছি। ইচ্ছানুসারে খোলা হয়, পরা যায়।
নির্মল । এর দরকার?
মাণিক। দিল্লীতে জানিতে পারিবে। দিল্লীতে ছদ্মবেশের দরকার হইতে পারে। আঙ্গুলকাটার ছদ্মবেশ চলে না। কিন্তু দুই রকম হইলে খুব চলে।
নির্মল হাসিল। তার পর মাণিকলাল একটি পিঞ্জরমধ্যে একটা পোষা পায়রা লইল। এই পারাবতটি অতিশয় সুশিক্ষিত। দৌত্যকার্যে সুনিপুণ। যাঁহারা আধুনিক ইউরোপীয় যুদ্ধে ‘Carrier-pigeon’ গুলির গুণ অবগত আছেন, তাঁহারা ইহা বুঝিতে পারিবেন। পূর্বে ভারতবর্ষে এই জাতীয় শিক্ষিত পারাবতের ব্যবহার চলিত ছিল। পারাবতের গুণ মাণিকলাল সবিশেষ নির্মলকুমারীকে বুঝাইয়া দিলেন।
রীতি ছিল যে, দিল্লীর বাদশাহের নিকট দূত পাঠাইতে হইলে, কিছু উপঢৌকন সঙ্গে পাঠাইতে হয়। ইংলণ্ড, পর্ত্তুগাল প্রভৃতির রাজারাও তাহা পাঠাইতেন। রাজসিংহও কিছু দ্রব্যসামগ্রী মাণিকলালের সঙ্গে পাঠাইলেন। তবে, অপ্রণয়ের দৌত্য, বেশী সামগ্রী পাঠাইলেন না।
অন্যান্য দ্রব্যের মধ্যে শ্বেতপ্রস্তরনির্মিত, মণিরত্নখচিত কারুকার্যযুক্ত কতকগুলি সামগ্রী পাঠাইলেন। মাণিকলাল তাহা পৃথক বাহনে বোঝাই করিয়া লইলেন।
অবধারিত দিবসে রাণার আজ্ঞালিপি ও পত্র লইয়া, নির্মল কুমারী সমভিব্যাহারে, দাস-দাসী, লোকজন, হাতী-ঘোড়া, উট-বলদ, শকট, এক্কা, দোলা, রেশালা প্রভৃতি সঙ্গে লইয়া বড় ঘটার সহিত মাণিকলাল তাম্বু ফেলিয়া নির্মলকুমারীকে ও অন্যান্য লোকজনকে তথায় রাখিয়া, একজন মাত্র বিশ্বাসী লোক সঙ্গে লইয়া দিল্লী চলিল। আর সেই পাথরের সামগ্রীগুলিও সঙ্গে লইল। গড়া আঙ্গুল খুলিয়া নির্মলকুমারীর কাছে রাখিয়া গেল। বলিল, “কাল আসিব |”
নির্মল জিজ্ঞাসা করিল, “ব্যাপার কি?”
মাণিকলাল একখানা পাথরের জিনিস নির্মলকে দেখাইয়া, তাহাতে একটি ক্ষুদ্র চিহ্ন দেখাইল। বলিল, “সকলগুলিতেই এইরূপ চিহ্ন দিয়াছি |”
নির্মল । কেন?
মাণিক। দিল্লীতে তোমাতে আমাতে ছাড়াছাড়ি অবশ্য হইবে। তার পর যদি মোগলের প্রতিবন্ধকতায়, পরস্পরের সন্ধান না পাই, তাহা হইলে, তুমি পাথরের জিনিস কিনিতে বাজারে পাঠাইও। যে দোকানের জিনিসে তুমি এই চিহ্ন দেখিবে, সেই দোকানে আমার সন্ধান করিও।
এইরূপ পরামর্শ আঁটিয়া মাণিকলাল বিশ্বাসী লোকটি ও প্রস্তরনির্মিত দ্রব্যগুলি লইয়া দিল্লী গেল। সেখানে গিয়া, একখানা ঘর ভাড়া লইয়া পাথরের দোকান সাজাইয়া, ঐ সমভিব্যাহারী লোকটিকে দোকানদার সাজাইয়া, শিবিরে ফিরিয়া আসিল।
পরে সমস্ত ফৌজ ও রেশালা এবং নির্মলকুমারীকে লইয়া পুনর্বার দিল্লী গেল। এবং সেখানে যথারীতি শিবির সংস্থাপিত করিয়া বাদশাহের নিকট সংবাদ পাঠাইল।
রাজসিংহ – ৬.৩
তৃতীয় পরিচ্ছেদ : অগ্নিচয়ন
