যুদ্ধক্ষেত্রের নিকটবর্তী এক নিভৃত স্থানে নির্মমল কে নামাইয়া দিয়া, তাহাকে সেইখানে বসিয়া থাকিতে উপদেশ দিয়া, মাণিকলাল, যেখানে রাজসিংহের সঙ্গে মবারকের যুদ্ধ হইতেছিল, একেবারে সেইখানে, মবারকের পশ্চাতে উপস্থিত হইল।
মাণিকলাল দেখিয়া যায় নাই যে, তৎপ্রদেশে যুদ্ধ উপস্থিত হইয়াছে। কিন্তু রন্ধ্রপথে রাজসিংহ প্রবেশ করিয়াছেন; হঠাৎ তাহার শঙ্কা হইয়াছিল যে, মোগলেরা রন্ধ্রের এই মুখ বন্ধ করিয়া রাজসিংহকে বিনষ্ট করিবে। সেই জন্যই সে রূপনগরে সৈন্য সংগ্রহার্থে গিয়াছিল, এবং সেই জন্য সে প্রথমেই এই দিকে রূপনগরের সেনা লইয়া উপস্থিত হইল। আসিয়াই বুঝিল যে, রাজপুতগণের নাভিশ্বাস উপস্থিত বলিলেই হয়–মৃত্যুর আর বিলম্ব নাই। তখন মাণিকলাল মবারকের সেনার প্রতি অঙ্গুলিনির্দেেশে করিয়া দেখাইয়া বলিল, “ঐ সকল দস্যু! উহাদিগকে মারিয়া ফেল |”
সৈনিকেরা কেহ কেহ বলিল, “উহারা যে মুসলমান!”
মাণিকলাল বলিল, “মুসলমান কি লুঠেরা হয় না? হিন্দুই কি এত দুষ্ক্রিয়াকারী? মার |”
মাণিকলালের আজ্ঞায় একেবারে হাজার বন্দুকের শব্দ হইল।
মবারক ফিরিয়া দেখিলেন, কোথা হইতে সহস্র অশ্বারোহী আসিয়া তাঁহাকে পশ্চাৎ হইতে আক্রমণ করিতেছে। মোগলেরা ভীত হইয়া আর যুদ্ধ করিল না। যে যে দিকে পারিল, সে সেই দিকে পলায়ন করিল। মবারক রাখিতে পারিলেন না। তখন রাজপুতেরা “মাতাজীকি জয়!” বলিয়া তাহাদের পশ্চাদ্ধাবিত হইল।
মবারকের সেনা ছিন্ন ভিন্ন হইয়া পর্বাতরোহণ করিয়া পলায়ন করিতে লাগিল, রূপনগরের সেনা তাহাদিগের পশ্চাদ্ধাবিত হইয়া পর্বইতরোহণ করিতে লাগিল। মবারক সেনা ফিরাইতে গিয়া, সহসা অশ্বসমেত অদৃশ্য হইলেন।
এই অবসরে মাণিকলাল বিস্মিত রাজসিংহের নিকট উপস্থিত হইয়া প্রণাম করিলেন, রাণা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি এ কাণ্ড মাণিকলাল? কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। তুমি কিছু জান?”
মাণিকলাল হাসিয়া বলিল, “জানি। যখন আমি দেখিলাম যে, মহারাজ রন্ধ্রপথে নামিয়াছেন, তখন বুঝিলাম যে, সর্ব“নাশ হইয়াছে। প্রভুর রক্ষার্থ আমাকে আবার একটি নূতন জুয়াচুরি করিতে হইয়াছে |”
এই বলিয়া মাণিকলাল যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, সংক্ষেপে রাণাকে শুনাইল। আপ্যায়িত হইয়া রাণা মাণিকলালকে আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন, “মাণিকলাল তুমি যথার্থ প্রভুভক্ত। তুমি যে কার্যর করিয়াছ, যদি কখন উদয়পুর ফিরিয়া যাই, তবে তাহার পুরস্কার করিব। কিন্তু তুমি আমাকে বড় সাধে বঞ্চিত করিলে। আজ মুসলমানকে দেখাইতাম যে, রাজপুত কেমন করিয়া মরে!”
মাণিকলাল বলিল, “মহারাজ! মোগলকে সে শিক্ষা দিবার জন্য মহারাজের অনেক ভৃত্য আছে। সেটা রাজকার্যেতর মধ্যে গণনীয় নহে এখন উদয়পুরের পথ খোলসা। রাজধানী ত্যাগ করিয়া পর্বরতে পর্বযতে পরিভ্রমণ করা কর্তরব্য নহে। এক্ষণে রাজকুমারীকে লইয়া স্বদেশে যাত্রা করুন |”
রাজসিংহ বলিলেন, “আমার কতকগুলি সঙ্গী এখন ও দিকের পাহাড়ের উপরে আছে–তাহাদের নামাইয়া লইয়া যাইতে হইবে |”
মাণিকলাল বলিল, “আমি তাহাদিগকে লইয়া যাইব। আপনি অগ্রসর হউন। পথে আমাদিগের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইবে |”
রাণা সম্মত হইয়া, চঞ্চলকুমারীর সহিত উদয়পুরাভিমুখী যাত্রা করিলেন।
রাজসিংহ – ৪.৭
সপ্তম পরিচ্ছেদ : স্নেহশালিনী পিসী
রাণাকে বিদায় দিয়া, মাণিকলাল রূপনগরের সেনার পশ্চাৎ পশ্চাৎ পর্বতরোহণ করিল। পলায়নপরায়ণ মোগলসেনা তৎকর্তৃক তাড়িত হইয়া যে যেখানে পাইল, পলায়ন করিল। তখন মাণিকলাল সৈনিকদিগকে বলিলেন, “শত্রুদল পলায়ন করিয়াছে–আর কোন বৃথা পরিশ্রম করিতেছ? কার্য সিদ্ধ হইয়াছে, রূপনগরে ফিরিয়া যাও |” সৈনিকেরাও দেখিল–তাও বটে, সম্মুখশত্রু আর কেহ নাই। মাণিকলাল যে একটা কারসাজি করিয়াছে, ইহাও তাহারা বুঝিতে পারিল। হঠাৎ যাহা হইয়া গিয়াছে, তাহার আর উপায় নাই দেখিয়া, তাহারা লুঠপাটে প্রবৃত্ত হইল। এবং যথেষ্ট ধনসম্পত্তি অপহরণ করিয়া সন্তুষ্টচিত্তে, হাসিতে হাসিতে, বাদশাহের জয়ধ্বনি তুলিয়া রণজয়গর্বে গৃহাভিমুখে ফিরিল। দণ্ডকাল মধ্যে পার্বত্য পথ জনশূন্য হইল–কেবল হত ও আহত মনুষ্য ও অশ্ব সকল পড়িয়া রহিল। দেখিয়া, উচ্চ পর্বতের উপরে প্রস্তরসঞ্চালনে যে সকল রাজপুত নিযুক্ত ছিল, তাহারা নামিল। এবং কোথাও কাহাকেও না দেখিয়া রাণা অবশিষ্ট সৈন্য সহিত অবশ্য উদয়পুর যাত্রা করিয়াছেন বিবেচনা করিয়া, তাহারাও উহার সন্ধানে সেই পথে চলিল। পথিমধ্যে রাজসিংহের সহিত সাক্ষাৎ হইল। সকলে একত্রে উদয়পুরে চলিলেন।
সকলে জুটিল–কেবল মাণিকলাল নহে। মাণিকলাল, নির্মলকে লইয়া বিব্রত। সকলকে গুছাইয়া পাঠাইয়া দিয়া, নির্মলের কাছে আসিয়া জুটিল। তাহাকে কিছু ভোজন করাইয়া, গ্রাম হইতে বাহক ও দোলা লইয়া আসিল। দোলায় নির্মলকে তুলিয়া, যে পথে রাণা গিয়াছেন, সে পথে না গিয়া ভিন্ন পথে চলিল–বমাল সমেত ধরা পড়ে, এমন ইচ্ছা রাখে না।
মাণিকলাল নির্মলকে লইয়া পিসীর বাড়ী উপস্থিত হইল। পিসীমাকে ডাকিয়া বলিল, “পিসীমা, একটা বউ এনেছি |” বধূ দেখিয়া পিসীমা কিছু বিষণ্ণ হইলেন–মনে করিলেন,-লাভের যে আশা করিয়াছিলাম, বধূ বুঝি ব্যাঘাত করিবে। কি করে, আশরফি নগদ লইয়াছে–একদিন অন্ন না দিয়া বধূকে তাড়াইয়া দিতে পারিবে না। সুতরাং বলিল, “বেশ বউ |”
মাণিকলাল বলিল, “পিসী, বহুর সঙ্গে আমার আজিও বিবাহ হয় নাই |”
পিসীমা বুঝিলেন, তবে এটা উপপত্নী। গো পাইয়া বলিলেন, “তবে আমার বাড়ীতে___”
মাণিকলাল। তার ভাবনা কি? বিয়ে দাও না? আজই বিবাহ হউক।
নির্মল লজ্জায় অধোবদন হইল।
পিসীমা আবার গো পাইলেন; বলিলেন, “সে ত সুখের কথা–তোমার বিবাহ দিব না ত কার বিবাহ দিব? তা বিবাহের ত কিছু খরচ চাই?”
মাণিকলাল বলিল, “তার ভাবনা কি?”
পাঠকের জানা থাকিতে পারে, যুদ্ধ হইলেই লুঠ হয়। মাণিকলাল যুদ্ধক্ষেত্র হইতে আসিবার সময়ে নিহত মোগল সওয়ারদিগের বস্ত্রমধ্যে অনুসন্ধান করিয়া কিছু সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিল–ঝনাৎ করিয়া পিসীর কাছে গোটাকত আশরফি ফেলিয়া দিলেন, পিসীমা আনন্দে পরিপ্লুত হইয়া তাহা কুড়াইয়া লইয়া পেটারায় তুলিয়া রাখিয়া বিবাহের উদ্যোগ করিতে বাহির হইলেন। বিবাহের উদ্যোগের মধ্যে ফুল চন্দন ও পুরোহিত সংগ্রহ, সুতরাং আশরফিগুলি পিসীমাকে পেটারা হইতে আর বাহির করিতে হইল না। মাণিকলালের লাভের মধ্যে তিনি যথাশাস্ত্র নির্মলকুমারীর স্বামী হইলেন। বলা বাহুল্য যে, মাণিকলাল রাণার সৈনিকদিগের মধ্যে বিশেষ উচ্চ পদ লাভ করিলেন, এবং নিজগুণে সর্বত্র সম্মান প্রাপ্ত হইলেন।
রাজসিংহ – ৫.১
পঞ্চম খণ্ড
অগ্নির আয়োজন
প্রথম পরিচ্ছেদ : শাহজাদী অপেক্ষা দুঃখী ভাল
