তাহলে তো শিল্প সাহিত্য সবই খেয়ালের সৃষ্টি সবই বাদ দিতে হয়।
না, মহীনদা বলেন, শিল্প, সাহিত্য আর সঙ্গীতের মধ্যে আছে অন্য একটা গতি, অন্তর্মুখী গতি যে পথে মানুষ নিজ আত্মাকে খুঁজে পায় আর, অতিমানসকে ধরতে পারে। খেলাটা পুরোপুরি বহির্মুখী। খেলাকে আমি নিন্দে করছি না, ওটা আমার স্বভাবের পরিপন্থী।
মিঃ আদিলিঙ্গম আর কিছু বললেন না, চা খেতে লাগলেন পরে শুধুলেন আপনার মহীনদা বুঝি আপনার গুরু? কে তিনি? কোথায় থাকেন?
গুরু নন, গুরু থাকেন উঁচুতে, মহীনদা আমাদের খুব কাছাকাছি এই মাটিতেই থাকেন। খেলা শেষ হলে আমাদের গানের মজলিসে মহীনদার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব যাবেন তো?
–হ্যাঁ নিশ্চয় যাব বললেন, আদিলিঙ্গম সস্নেহে।
অতঃপর মাধুরী নমস্কার জানিয়ে চলে গেল। ওদের খেলা আরম্ভ হল। মিঃ আদিলিঙ্গম ভালো খেলোয়াড়, এক একটি বলের এমন চমৎকার মার তিনি দিতে লাগলেন যে বিপক্ষ দলের আনন্দ হয়। গেম শেষ হতে দেরী হবে।
ওদিকে মহেন্দ্র গানের আসরটা সাজিয়ে ভাবছে কোথায় মাধুরী? কিন্তু মাধুরী আসবার আগে এলো ছোটদা রতীন্দ্র। বেহালাটা নিয়া সুর বাঁধতে লাগলো এই ফাঁকে প্রশ্ন মহেন্দ্র। বাজাতে পারে কিনা।
না, বললো মহেন্দ্র। রতীন্দ্র অবাক হয়ে তার মুখ পানে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলো, তাহলে কোন যন্ত্র বাজাও তুমি। বেহালার মতন সুরের যন্ত্র আর কিছু আছে নাকি;
–কি জানি। ধীর কণ্ঠে বললো মহেন্দ্র আমাদের বাড়িতে বেহালা নেই। আছে মৃদঙ্গ, তানপুরা, তবলা, ভুকি, মাদলা, মন্দিরা।
ব্যাস ওতেই গান বাজনা চলে?
হ্যাঁ এখন আর চলে না, আগে চলতো। মানে আমার বাবার আমলে।
–হারমোনিয়াম নেই?
: না ও আমরা বাজাই না, আমাদের তিন পুরুষের যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেছে। ছেলেটাকে যে কি করে শিখাবো। এসো বলে রতীন অভ্যর্থনা জানালো। সংগীতের আসর হল ওদের। কিন্তু কোথায় মাধুরী? আশ্চর্য তো! যার আসর সেই উপস্থিত নেই। খেলা শেষ হলেই মিঃ আদিলঙ্গম কুমার এবং মেজবৌদি ঢুকলো।
মেজবৌদি বললো, এই মহীন ঠাকুরপো, আর ইনি মিঃ আদিলিঙ্গম।
সবিনয়ে নমস্কার জানালো মহীন। ওরা বসার পর একজন একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইলেন অন্যজন একটা ভজন। রতীন বেহালা বাজালো মাধুরী এখনো আসছে না এর পরে কে গাইবে? মেজবৌদি বললো মহীন ঠাকুরপো গান একখানা। মহীন সেতার বাজাচ্ছিল সেটা বাজাতে লাগলো। বাজাচ্ছেই সুর ক্রমশঃ আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে ঘরখানাকে, সারা বাড়িটাকে, ধীরে মধুর রাগিনী একি গুঞ্জন। একি অন্তর্বেদনার নিগঢ় অভিব্যক্তি একি বাষ্পকুল ব্যাথা। বিলাস। দিকে দিকে ক্রন্দসী যেন হেমন্তের শিশির ঝরা আকাশে আবিল করে দিল অশ্রু পঙ্কিল করে তুললো। অন্তত প্রাণের আকুল দেবতা যেন আর্তহাহাকারে মুর্ছিত হয়ে পড়েছে। কোন এক নিষ্ঠুর দেবতার চরণমুলে ‘ওগো যন্ত্ৰী’ অসহনীয় আনন্দ আর ধরতে পারিনি থামাও তোমার মুরলী।
নিস্তব্ধ হয়ে গেছে বাড়িটা। মাধুরী কখন এসে একধারে নীরবে দাঁড়িয়েছে কেউ দেখেনি। শেষ হবার পর প্রায় আধ মিনিট ঘরখানায় যেন রেশ রয়েছে। মিঃ আদিলিঙ্গম রসজ্ঞ শ্রোতা এতক্ষণে তিনি বললেন, উঠতে উঠতে এসো তোমাকে আলিঙ্গন করে ধন্য হই।
মহীনের দুই গণ্ডা অশ্রুপ্লাবিত, মানুষ যে বাজাতে বাজাতে এমন করে কাঁদে এ ওরা এর আগে কখনও দেখেনি। মিঃ আদিলিঙ্গম মহীনকে বুকে জড়িয়ে বললেন এই অন্তর্মুখিনতটা ভারতের নিজস্ব সাধনা এঁকে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দাও বন্ধু মানুষের আত্মা আবার স্বধর্মে প্রতিষ্ঠিত হোক।
মহেন্দ্র মাথা নুইয়ে এই বয়োঃবৃদ্ধ খেলোয়াড়ের আশীর্বাদ গ্রহণ করলো।
বয়সে তুমি ঢের ছোট, কিন্তু যেখানে তুমি বড় বিরাট, সেখানে আমাদের শ্রদ্ধা অগাধ, অকুণ্ঠ হয়ে রইল।
মহীনের চোখ ছাপিয়ে আবার জল এল–কিছু সে বলতে পারলো না উত্তরে।
বাগান বাড়িটা কেনা হয়েছে, কিন্তু মাধুরী এখনো ওটা দেখেনি, আজ সকালে মহেন্দ্রকে বললো চলতো দমদমার বাগানটা দেখে আসি।
: আমার একটু কাজ ছিল মাধুরী। মহেন্দ্র সভয়ে বলল। জানি। ও গল্প উর্বশীতে’ না পাঠিয়ে। উত্তরায়ণে পাঠাতে ওদের অফিস দশটার পর খোলে। উর্বশী সিনেমার কাগজ। উত্তরায়ণ মাসিক কাগজ ভালো কাগজ।
তুমি কি করে জানলে আমার গল্পের ব্যাপার মাধুরী?
–জানলাম, না জেনে আমার চলে না যে। চৌদ্দ টাকা মনি অর্ডারের কথা জেনেছি রসিদ দেখে।
লজ্জায় মহেন্দ্র হয়তো মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইতো, কিন্তু মাধুরীই তাকে রক্ষা করলো বলল ভালো করছো, নিজের উপার্জনের টাকা যত কমই হোক, তার মূল্য হিসেবে হয় না এসো, উঠে পড়ো গাড়িতে।
মহেন্দ্র আর কিছু বলবার অবকাশ পেল না, কোটখানা গায়ে চড়াতে চড়াতে গাড়িতে উঠলো গিয়ে। মাধুরী তার আগেই উঠে বসে আছে, বললো গান গাওয়া আমি ছেড়ে দিলাম মহীনদা।
: কেন? মহীন অতি বিস্ময়ে প্রশ্ন করলো।
: এতাকাল আমার ধারণা ছিল যে গান শুধু গলার ব্যাপার। মিষ্টি গলা আর তাকে খেলিয়ে সুর বের করতে পারলেই গান হয় কাল জানলাম, তা নয়।
–কেন? ব্যাপারটা তো মূলতঃ ঐ গলারই কারসাজি। গলার অবশ্য শেষ শ্রুতি পর্যন্ত পৌঁছানো যায় না, তার জন্য দরকার যন্ত্রের, কিন্তু গলার মূল্য কম নয়।
–না’ গলায় কারসাজিকে গলাবাজি বলা যায় তাতে গান হয় সংগীত হয় না, গীত তো নয়ই ওর জন্য দরকার সে দুঃখানুভূতির যেটা গলাতে না মহীনদা; সে থাকে অন্তরে। সেখান থেকে সুর আহরণ করে যে অমৃতময় পরিমণ্ডলের সৃষ্টি হয়, গলা তাকে পরিবেশন করে মাত্র।
