মেজদিকে ম্যানেজ করে কলেজ থেকে সাতদিনের ছুটি নিয়ে ও আমার কাছে এসেছিল। এসেছিল অনেক কারণে, অনেক প্ৰয়োজনে। সমাজ-সংস্কারের অকটোপাশ থেকে মুক্ত করে একটু মিশতে চেয়েছিলাম। আমরা দুজনেই। মেমসাহেবের দিল্লী আসার কারণ ছিল সেই মুক্তির স্বাদ, আনন্দ উপভোগ করা।
আরো অনেক কারণ ছিল। শূন্যতার মধ্যে দুজনেই অনেক দিন ভেসে বেড়িয়েছিলাম। দুজনেরই মন চাইছিল একটু নিরাপদ আশ্রয়। সেই আশ্রয়, সেই সংসার বাঁধার জন্য অনেক কথা বলবার ছিল। দুজনেরই মনে মনে অনেক কল্পনা আর পরিকল্পনা ছিল। সেসব সম্পর্কেও কথাবার্তা বলে একটা পাকা সিদ্ধান্ত নেবার সময় হয়েছিল।
যাই হোক এক সপ্তাহ কোন কাজকর্ম করব না বলে আমিও ছুটি নিয়েছিলাম। প্ৰতিজ্ঞা করেছিলাম মেমসাহেবকে ট্রেনে চড়িয়ে না দেওয়া পৰ্যন্ত টাইপরাইটার আর পার্লামেণ্ট হাউস স্পৰ্শ করব না। চেয়েছিলাম প্রতিটি মুহুর্ত মেমসাহেবের সান্নিধ্য উপভোগ করব।
সত্যি বলছি দোলাবৌদি, একটি মুহুৰ্তও নষ্ট করিনি। ভগবান আমাদের বিধি-নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ জানতেন বলে একটি মুহুৰ্তও অপব্যয় করতে দেননি। কথায়, গল্পে, গানে, হাসিতে ভরিয়ে তুলেছিলাম ঐ ক’টি দিন।
লাঞ্চ খেতে খেতে অনেক বেলা হয়েছিল। চব্বিশ ঘণ্টা ট্রেন জানি করে নামবার পর থেকে মেমসাহেব একটুও বিশ্রাম করতে পারে নি। আমি বললাম, মেমসাহেব, তুমি একটু বিশ্রাম কর, একটু ঘুমিয়ে নাও।
এই ক’মাসে কলকাতায় অনেক ঘুমিয়েছি, অনেক বিশ্রাম করেছি। তুমি আর আমাকে ঘুমুতে বল না।
এক মিনিট পরেই বলল, তার চাইতে তুমি বরং একটু খোও। আমি তোমার গায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
আমি কেন শোব?
শোও না। আমি তোমার পাশে বসে বসে গল্প করব।
শোবার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু লোভ সামলাতে পারলাম না। দিল্লীর কাব্যহীন জীবনে অনেকদিন এমনি একটি পরম দিনের স্বপ্ন দেখেছি।
মেমসাহেব বিশ্রাম করল না। কিন্তু আমি সত্যি সত্যিই শুয়ে পড়লাম। ও আমার পাশে বসে মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গুনগুন করে গান গাইছিল। কখনও কখনও আবার একটু আদর করছিল। কি আশ্চৰ্য আনন্দে যে আমার সারা মন ভরে গিয়েছিল, তা তোমাকে বোঝাতে পারব না। স্বপ্ন যে এমন করে বাস্তবে দেখা দিতে পারে, তা ভেবে আমি অদ্ভুত সাফল্য, সার্থকতার স্বাদ উপভোগ করলাম।
বালিশ দু’টোকে ডিভোর্স করে মেমসাহেবের কোলে মাথা রেখে দু’হাত দিয়ে ওর কোমরটা জড়িয়ে ধরে চোখ বুজলাম।
ও জিজ্ঞাসা করল, ঘুম পাচ্ছে?
কথা বললাম না, শুধু মাথা নেড়ে জানালাম, না।
ক্লান্ত লাগছে?
তবে?
স্বপ্ন দেখছি।
স্বপ্ন?
মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ, স্বপ্ন দেখছি।
মুখটা আমার মুখের কাছে এনে ও জানতে চাইল, কি স্বপ্ন দেখছি?
তোমাকে স্বপ্ন দেখছি।
আমাকে?
হ্যাঁ, তোমাকে।
আমি তো তোমার পাশেই রয়েছি। আমাকে আবার কি স্বপ্ন দেখছি?
ওর কোলের পর মাথা রেখেই চিৎ হয়ে শুলাম। দু’হাত দিয়ে ওর গলাটা জড়িয়ে ধরে বললাম, হ্যাঁ, তোমাকেই স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্ন দেখছি, জন্ম-জন্মান্তর ধরে আমি এমনি করে তোমার কোলে নিশ্চিন্ত আশ্রয় পাচ্ছি, ভালবাসা পাচ্ছি, ভরসা পাচ্ছি।
মুহুর্তের জন্য গর্বের বিদ্যুৎ চমকে উঠে মেমসাহেবের সারা মুখটা উজ্জল করে তুললে। পরের মুহুর্তেই ওর ঘন কালো গভীর উজ্জল দু’টো চোখ কোথায় যেন তলিয়ে গেল। আমাকে বলল, ওগো, তুমি আমাকে অমন করে চাইবে না, তুমি আমাকে এত ভালবাসবে না।
কোন বল তো?
যদি কোনদিন কোন কিছু দুর্ঘটনা ঘটে, যদি কোনদিন আমি তোমার আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে চলতে না পারি, সেদিন তুমি সে দুঃখ, সে আঘাত সহ্য করতে পারবে না।
আমি মাথা নাড়তে নাড়তে বললাম, তা হতে পারে না মেমসাহেব। আমার স্বপ্ন ভেঙে দেবার সাহস তোমারও নেই, ভগবানেরও নেই।
আমার কথা শুনে বোধহয় ওর একটু গৰ্ব হলো। বলল, আমি জানি তুমি আমাকে ছাড়া তোমার জীবন কল্পনা করতে পার না। কিন্তু তাই বলে অমন করে বলে না।
কেন বলব না। মেমসাহেব? তোমার মনে কি আজো কোন সন্দেহ আছে?
সন্দেহ থাকলে কেউ এমন করে ছুটে আসে!
মেমসাহেব। আবার থামে। আবার বলল, তোমার দিক থেকে যে আমি কোন আঘাত পাব না, তা আমি জানি। ভয় হয় নিজেকে নিয়েই। আমি কি পারব তোমার আশা পূর্ণ করতে? পারব কি সুখী করতে?
তুমি না পারলে আর কেউ তো পারবে না। মেমসাহেব। তুমি না পারলে স্বয়ং ভগবানও আমাকে সুখী কয়তে পারবেন না।
আরো কত কথা হলো। কথায় কথায় বেলা গড়িয়ে যায়, বিকেল ঘুরে সন্ধ্যা হলো। ঘর-বাড়ি রাস্তাঘাটে আলো জ্বলে উঠল।
মেমসাহেব বলল, ছাড়। আলোটা জেলে দিই। না, না, আলো জেলে না। এই অন্ধকারেই তোমাকে বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আলো জ্বালালেই আরো অনেক কিছু দেখতে হবে।
পাগল কোথাকার।
এমন পাগল আর পাবে না।
ও আমাকে চেপে জড়িয়ে ধরে বলল, এমন পাগলীও আর পাবে না।
ভগবান অনেক হিসাব করেই পাগলার কপালে পাগলী জুটিয়েছেন। তা না হলে, কি এত মিল, এত ভালবাসা হয়? ঐ অন্ধকারের মধ্যেই আরো কিছু সময় কেটে গেল। মেমসাহেব বলল, চলো, একটু ঘুরে আসি। তোমার কি বেড়াতে ইচ্ছা করছে? কলকাতায় তো কোনদিন শান্তিতে বেড়াতে পারিনি। এখানে অন্ততঃ কোন দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুরতে হবে না।
মেমসাহেব আলো জ্বালল। বেল টিপে বেয়ারা ডাকল। চা আনাল। চা তৈরী করল। আমি শুয়ে শুয়েই এক কাপ চা খেলাম।
