নিউদিল্লী স্টেশনে গেছি। ডিলুক্স এয়ার কণ্ডিশনড এক্সপ্রেস অ্যাটেণ্ড করতে। মেমসাহেব। আসছে। জীবনের এক অধ্যায় শেষ করে নতুন অধ্যায় শুরু করার পর ওর সঙ্গে এই প্ৰথম দেখা হবে।
লাউডস্পীকারে অ্যানাউন্সিমেণ্ট হলো, এ-সি-সি এক্সপ্রেস এক্ষুনি একনম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছবে। আমি সানগ্লাসটা খুলে রুমাল দিয়ে মুখটা আর একবার মুছে নিলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে দু’একটা টান দিতে না দিতেই ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ল। এদিক-ওদিক দেখতে না দেখতেই মেমসাহেব দু নম্বর চেয়ার কার থেকে বেরিয়ে এলো।
কিন্তু একি? মেমসাহেবের কি বিয়ে হয়েছে? এত সাজগোছ? এত গহনা? মাথায় কাপড়, কপালে অতবড় সিঁদুরের টিপ।
মেসাহেবকে কোনদিন এত সাজগোছ করতে দেখিনি। গহনা? শুধু ডানহাতে একটা কঙ্কণ। ব্যাস, আর কিছু না। গলায় হার? না, তাও না। কোন এক বন্ধুর বিপদে সাহায্য করার জন্য গলায় হার দিয়েছেন। তাছাড়া মাথার কাপড় আর কপালে অতবড় একটা সি দুরের টিপ দেখে অবাক হবার চাইতে ঘাবড়ে গেলাম বেশী। মুহুর্তের জন্য পায়ের নীচে থেকে যেন মাটি সরে গেল। গলাটা শুকিয়ে এলো, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দে দিল। দুনিয়াটা ওলট-পালট হয়ে গেল।
প্ৰথমে ভাবলাম স্টেশন প্ল্যাটফর্মে ঐ কয়েক হাজার লোকের সামনে ওর গালে ঠাস করে একটা চড়, মারি। বলি, আমাকে অপমান করবার জন্য এত দূরে না এসে শুধু ইনভিটেশন লেটারটা পাঠালেই তো হতো।
আবার ভাবলাম, না, ওসব কিছু করব না, বলব না।
বিশেষ কথাবার্তা না বলে সোজা গিয়ে ট্যাক্সি চড়লাম।
ট্যাক্সিতে উঠেই মেমসাহেব আমাকে প্ৰণাম করল। আমার বাঁ হাতটা টেনে নিল নিজের ডান হাতের মধ্যে। জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছ?
আমার কথা ছেড়ে দাও। এখন বল তুমি কেমন আছ? তোমার বিয়ে কেমন হলো? বর কেমন হলো? সর্বোপরি তুমি দিল্লী এলে কেন?
মেমসাহেব একেবারে গলে গেল, সত্যি বলছি, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। এমন হঠাৎ সবকিছু হয়ে গেল যে কাউকেই খবর দেওয়া হয় নি।…
ছেলেটি কেমন?
বেশ গর্বের সঙ্গে উত্তর এলো, ব্রিলিয়াণ্ট!
কোথায় থাকেন।
এইত তোমাদের দিল্লীতেই।
আমি চমকে উঠি, দিল্লিতে?
ও আমার গালটা একটু টিপে দিয়ে বলে, ইয়েস স্যার। তবে কি আমার বর আদি সপ্তগ্রাম বা মছলন্দপুর থাকবে?
ট্যাক্সি কনটপ্লেস ঘুরে জনপদে ঢুকে পড়ল। আর এক মিনিটের মধ্যেই ওয়েস্টার্ন কোর্ট এসে যাবে। জিজ্ঞাসা করলাম, এখন কোথায় যাবে?
কোথায় আবার? তোমার ওখানে।
ট্যাক্সি ওয়েস্টার্ন কোর্টে ঢুকে পড়ল। থামল। আমরা নোমলাম। তাড়া মিটিয়ে ছোট্ট সুটকেসটা হাতে করে ভিতরে ঢুকলাম। রিসেপশন থেকে চাবি নিয়ে লিফট্-এ চড়লাম। তিন তলায় গেলাম। আমার ঘরে এলাম।
মাথার কাপড় ফেলে দিয়ে দু’হাত দিয়ে মেমসাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আঃ কি শান্তি।
আমার বুকটা জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই থেমে গেল। ওর সিথিতে সিন্দুর না দেখে বুঝলাম…
এবার আমিও আর স্থির থাকতে পারলাম না। দু’হাত দিয়ে টেনে নিলাম বুকের মধ্যে। আদর করে, ভালবাসা দিয়ে ওকে। ক্ষতবিক্ষত করে দিলাম। আমি। মেমসাহেবও তার উন্মত্ত যৌবনের জোয়ারে আমাকে অনেক দূর ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আমার দেহে, মনে ওর ভালবাসা, আবেগ উচ্ছলতার পলিমাটি মাখিয়ে দিয়ে গেল। আমার মন আরো উর্বরা হলো।
এতদিন পরে দুজনে দুজনকে কাছে পেয়ে প্ৰায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিলাম। কতক্ষণ যে ঐ জোয়ারের জলে ডুবেছিলাম, তা মনে নেই। তবে সম্বিত ফিরে এলো, দরজায় নক করার আওয়াজ শুনে। তাড়াতাড়ি দুজনে আলাদা হয়ে বসলাম। আমি বললাম, কোন?
ছোট সাব, ম্যায়।
ও জিজ্ঞেসা করল, কে?
আমি বললাম, গজানন।
উঠে গিয়ে দরজা খুলে ডাক দিলাম, এসো, ভিতরে এসে। মেমসাহেবকে দেখেই গজানন দু’হাত জোড় করে। প্ৰণাম করল, নমস্তে বিবিজি!
ও একটু হাসল। বলল, নমস্তে।
আমি বললাম, গজানন, বিবিজিকে কেমন লাগছে? বহুত আচ্ছা, ছোট সাব। এক সেকেণ্ড। পরে আবার বলল, আমার ছোট-সাহেবের বিবি কখনও খারাপ হতে পারে?
আমরা দুজনেই হেসে ফেলি। মেমসাহেব বলল, গজানন, বাবুজি প্ৰত্যেক চিঠিতে তোমার কথা লেখেন।
গজানন দু’হাত কচলে বলে, ছোটসাবকা মেহেরবানি।
আমি উঠে গিয়ে গজাননের পিঠে একটা চাপড় মেরে বলি, জান মেমসাহেব, গজানন আমার লোক্যাল বস। আমার গার্ডিয়ান।
কিয়া করেগা বিবিজি, বাতাও। ছোটসাব এমন বিশ্ৰী কাজ করে যে কোন সময়ের ঠিক ঠিকানা নেই। তারপর কিছু সংসারী বুদ্ধি নেই। আমি না দেখলে কে দেখবে বল? গজানন প্ৰায় খুনী আসামীর মত ভয়ে ভয়ে জেরার জবাব দেয়।
গজানন এবার মেমসাহেবকে জিজ্ঞাসা করে, বিবিজি, ট্রেনে কোন কষ্ট হয় নি তো?
মেমসাহেব বললো, না, না, কষ্ট হবে কেন? গজানন চট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের দুজনের ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসে। ব্রেকফাস্টের ট্রে নামিয়ে রেখে গজানন চলে যায়, আমি যাচ্ছি। একটু পরেই আসছি।
গজানন চলে যাবার পর আমি মেমসাহেবের কোলে শুয়ে পড়লাম। আর ও আমাকে ব্রেকফাস্ট খাইয়ে দিতে লাগল।
দোলাবৌদি, মেমসাহেব। আর আমি অনেক কাণ্ড করেছি। বাঙালী হয়েও প্রায় হলিউড ফিল্মে অভিনয় করেছি। শেষপর্যন্ত অবশ্য শরৎ চাটুজ্যের হিটু বই-এর মত হয়ে গেছে। আস্তে, আস্তে, ধীরে ধীরে সব জানবে। বেশী ব্যস্ত হয়ে না।
১৪. মেমসাহেবের দিল্লীবাস
মেমসাহেবের দিল্লীবাসের প্রতিটি মুহুর্তের কাহিনী জানিবার জন্য তুমি নিশ্চয়ই পাগল হয়ে উঠেছ। মেমসাহেব কি বলল, কি করল, কেমন করে আদর করল, কোথায় কোথায় ঘুরল ইত্যাদি ইত্যাদি হাজার রকমের প্রশ্ন তোমার মনে উদয় হচ্ছে। তাই না? হবেই তো। শুধু তুমি নও, সবারই হবে।
