আমি মধুর গলায় বললাম, স্যার দুকাপ চা দিতে বলুন। আমারটায় চিনি একটু বেশি— তিন চামচ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ চায়ে চিনি বেশি খেতে খেতেন বলে আমি সবদিকেই উনাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করছি। চিনি নিয়ে কবিগুরু একটা গানও লিখেছেন। গানটা কি শুনেছেন?
ডিউটি অফিসার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরেছেন। পুলিশের ঠোঁট কামড়ানোর মানে হল–দশ নম্বর সিগন্যাল। তুফান এল বলে। আমি শান্ত গলায় বললাম, চিনি নিয়ে লেখা রবীন্দ্রনাথের গানটা হচ্ছে—
চিনি গো চিনি তোমারে
ওগো বিদেশিনি।
অর্থাৎ তিনি বিদেশী চিনির কথা বলছেন। দেশি চিনি ময়লা লালচে ধরনের। বিদেশী চিনি ফকফকা সাদা।
ডিউটি অফিসার কলিং বেলে চাপ দিলেন। এখন তাঁর মুখে সামান্য হাসি দেখা গেল। মাকড়সার জালে পোকা আটকে পরার পর মাকড়সা পোকার দিকে তাকিয়ে যেরকম হাসি দেয় সেরকম হাসি।
আমিও হাসলাম। তবে হাসি তৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে বললাম— এই গানটার ইংরেজি শুনবেন—চিনিগো চিনি তোমারে Sagar Sugar you…
কলিং বেল শুনে রাইফেল কাঁধে এক পুলিশ উপস্থিত হল। বেচারা অতি দুর্বল টাইপ। রাইফেলের ভারে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। কুঁজো হয়ে গেছে। এই পুলিশকে বাইরে ডিউটিতে পাঠানো ঠিক হবে না। প্রথম সুযোগেই সে রাইফেল কোনো ডাস্টবিনে ফেলে বাড়ি চলে যাবে ঘুমুবার জন্যে।
দুর্বল পুলিশ খুবই কষ্ট করে ডিউটি অফিসারকে একটা স্যালুট দিল। ডিউটি অফিসার আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন— একে নিয়ে লকারে ঢোকাও। বড় সাহেব আসুক তারপর ব্যবস্থা নিব? হারামজাদার তেল বেশি হয়েছে–তেল কমায়ে দেই।
আমি হাজতে ঢুকে পড়লাম। হাজতে আমাকে নিয়ে মোট ছজন। আমি সবার দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের মতো হাত নেড়ে বললাম— শুভ সকাল। আপনারা সবাই ভালো? কেউ জবাব দিল না। শুধু আবুল কালাম সাহেব চোখ পিটপিট করতে লাগলেন। মনে হল তিনি চোখে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন না। ভদ্রলোক যে ভালো ডলা খেয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। তার একটা চোখ বড় একটা ছোট। কপালের একই অংশ নৈনিতালের আলুর মতো ফুলে আছে। দেখে মনে হচ্ছে পার্মানেন্ট ব্যবস্থা। এই ফোলা কখনো কমবে না। বাকি জীবন কপালে আলু নিয়ে ঘুরতে হবে। আগে পুলিশের মারের মধ্যে রাখ ঢাক ছিল। দেখে কিছু বোঝা যেত না। মারটাও তার শিল্পকর্মের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল— এখন সে অবস্থা নেই। ইচ্ছা হল মেরে ফেললাম— পানির ট্যাংকে ফেলে দিলাম; ডেডবডি প্ৰকাশ হয়ে পড়লেও ক্ষতি নেই–পত্রিকায় বিবৃতি দেওয়া হবে – এই লোক পানির ট্যাংকে গিয়েছিল পানি খেতে। তারপর পা পিছলে ট্যাংকে পড়ে গেছে। সেখানেই মৃত্যু।
ডাক্তাররা সুরতহাল করবেন। তারাও রিপোর্ট দেবেন— লাংসে পানি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ পানিতে ডুবে মৃত্যু। মাথায় আঘাতের চিহ্ন আছে—পানির ট্যাংকের ঢাকনায় ধাক্কার কারণে তা হতে পারে।
হিমু সাহেব।
জি। আমাকে চিনতে পারছেন? আমি আবুল কালাম।
চিনতে পারছি। কেমন আছেন? আবুল কালাম জবাব দিলেন না। শূন্য দৃষ্টিতে তাকালেন। আমি বললাম, আপনাকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছি।
আবুল কালাম বিড়বিড় করে বললেন, শুকরিয়া।
বেচারা যে ঘোরের মধ্যে চলে গেছে এটা স্পষ্ট। যে ছাড়িয়ে নিতে এসেছে। সে আছে হাজতে এই সমস্যা তাকে বিচলিত করছে না। তবে অন্য হাজতিরা এখন আমাকে কৌতূহলী চোখে দেখছে। এদের মধ্যে একজনের চেহারা এবং কাপড়াচোপড় শোভন শ্রেণীর। চোখে সোনালি রঙের চশমা। কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল টাইপ চেহারা। তিনি কাছে ঝুকে এলেন। আমাদের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, ভাই সাহেব ভালো আছেন? তিনি জবাব দিলেন না। মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন।
আমি আবুল কালাম সাহেবের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললাম, বেশি মেরেছে?
আবুল কালাম ক্ষীণ গলায় বললেন, জি না। সন্ধ্যার পর মারবে।
আমি বললাম, ঘণ্টা দু-একের মধ্যে ছাড়া পাবেন; সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকতে হবে না।
আবুল কালাম ফিসফিস করে আবারো বললেন, শুকরিয়া।
হাজত থেকে বের হয়েই গরম পানি দিয়ে একটা গোসল দেবেন। সাবান ডলা দিয়ে হেভি গোসল। তারপর দুটা প্যারাসিটামল খাবেন, একটা খাবেন। সিডাকসিন। গনিমিয়ার চায়ের দোকান থেকে চা আনিয়ে দেব। মগভরতি এক মগ চা খাকেন। সঙ্গে একটা বেনসন সিগারেট— দেখবেন কেমন লাগে।
জি আচ্ছা। শুকরিয়া।
একটু পরপর শুকরিয়া বলছেন কেন? ঘটনা কী? আবুল কালাম ফিসফিস করে বললেন, মাথা আউলায়ে গেছে হিমু ভাই। কী বলতেছি না বলতেছি নিজেও জানি না। ছোট বেলায় মায়ের হাতে মার খেয়েছি তারপর পুলিশের কাছে মার খেলাম। কলিজা নড়ে গেছে। সন্ধ্যার পর নাকি আসল মার দিবে। আসল মারা মারার যে লোক তার ডিউটি সন্ধ্যার পর।
পুলিশ ধরেছে কেন?
মেসের মালিক সবুর সাহেবের শালার দুই লাখ টাকা চুরি গেছে। তার ধারণা টাকাটা আমি চুরি করেছি। পুলিশকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছেন টাকা উদ্ধারের জন্য। উদ্ধার হলে আরো দশ দিবে। এই হল কনট্রাক্ট। টাকা উদ্ধারের জন্যে পুলিশ দফায় দফায় মারছে। সন্ধ্যার পর ফাইন্যাল মারা মারবে।
এতক্ষণ পর্যন্ত কি হয়েছে সেমি ফাইন্যাল।
জি। মনে হয় রাতে জানেই মেরে ফেলবে।
টাকা কি আপনি নিয়েছেন?
জি না ভাইজান। আমি ছোটখাটো চুরি করি। মেসের বাজার করতে গিয়ে তিরিশ টাকা সরায়ে ফেললাম। হেঁটে কাচা বাজারে যাই—–বিলের সময় লেখি রিকশা ভাড়া পনরো টাকা। এইসব করি। বড় চুরি কী ভাবে করব বলেন? বড় চুরি করতে বড় কইলজা লাগে। আমার কইলজা ছোট। অতিরিক্ত ছোট। ভয়ে অস্থির হয়ে থাকি। আমার পেটে পুলিশ হাঁটু দিয়ে গুতা দিয়েছে। ব্যথা সেরকম পাই নাই, কিন্তু ভয়ের চোটে পিসাব করে দিয়েছি। বালতি দিয়ে পানি এনে সেই পিসাব নিজেই ধুয়েছি। কী লজ্জার কথা বলেন দেখি।
