মাথায় কি ফুল-ফল এখনো ঘুরছে?
হুঁ।
কতক্ষণ থাকে?
কোনো ঠিক নেই। তিন-চার ঘন্টা থাকে–আবার বেশ অনেক দিন থাকে এ রকম হয়েছে। আমার সবচে বেশি ছিল— ২৭ দিন। আমাকে হাসপাতালে ভরতি করতে হয়েছিল।
বল কী? সবচে বেশি দিন যে লাইনটা ছিল সেটা মনে আছে?
আছে।
বলতে অসুবিধা আছে? নাকি বললে সেটা আবার ঘোরা শুরু করবে।
না ঘোরা শুরু করবে না। ২৭ দিন যে লাইনটা আমার মাথায় ছিল সেটা হল—what a day বাসে করে মেরিল্যান্ড যাচ্ছিলাম। মাঝপথে গাড়ির চাকার হাওয়া চলে গেল। হাইওয়ের এক পাশে গাড়ি রেখে ড্রাইভার গাড়ির চাকা বদলাচ্ছে। যাত্রিরা সবাই বাস থেকে নেমেছে। আমিও নামলাম! দেখি খুবই অপূর্ব দৃশ্য। শীতের শুরুতে পাতা ঝরার আগে পাতাগুলি লাল হয়ে যায়। তাই হয়েছে পুরো বন লালচে হয়ে গেছে। ঝলমলে রোদ, নীল আকাশ। আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম— what a day! এই বলাই আমার কাল হল। সাতাশ দিন what a day মাথায় নিয়ে বসে রইলাম।
এই বাক্যটা তো মনে হয় তুমি প্রায়ই বল। আজো দুবার বলেছ।
হুঁ।
তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?
হ্যাঁ। মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়েছে।
ফুল-ফল মাথায় ফুল স্পিডে ঘুরছে?
হুঁ।
এক কাজ কর। কদম ফুলগুলি ফেলে দাও। চোখের সামনে ফুল-ফুল কিছু থাকবে না।
না ফুল ফেলব না। আমি বাসায় চলে যাব। আমি হাঁটতে পারব না–রিকশা বা বেবিটেক্সি নিন।
মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। সেইসঙ্গে ঝড়ো হাওয়া। আশা একটু পরপর মাথা বাঁকাচ্ছে। তার চোখ লাল। মনে হয় তার খুব কষ্ট হচ্ছে।
আমি বললাম, মাথার যন্ত্রণাটা কি খুব বেশি?
আশা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। ক্ষীণ গলায় বলল, বাসায় যাব। জ্বরটা মনে হয় চেপে আসছে। আমি দুঃখিত। সারাদিনের প্রোগ্রাম নষ্ট হল। একটা রিকশার ব্যবস্থা করুন না!
মাঠের মাঝখানে তো রিকশা আসবে না। তোমাকে হেঁটে রাস্তা পর্যন্ত যেতে হবে। পারবে না!
আশা চাপা গলায় বলল, না।
এখন মেয়েটা কাঁদতে শুরু করেছে; চোখের পানির রহস্যময় ব্যাপার হচ্ছে— ঝমঝম বৃষ্টির পানির মধ্যেও চোখের পানি আলাদা করা যায়।
মাথা মালিশ
কেউ একজন মাথা মালিশ করে দিচ্ছে। নরম হাত চুলের উপর দিয়ে বুলিয়ে নিচ্ছে! মাঝে মাঝে চুলের ভেতর দিয়ে চিরুণি চলার মত হচ্ছে। বেছে বেছে এমন সব চুলের গুচ্ছ ধরে টান দিচ্ছে যাদের টান দেওয়াই উচিত। অতি আরামদায়ক অবস্থা। মাথা মালিশের এই অপূর্ব কারিগর যে জয়নাল সাহেব তা বুঝতে পারছি। নেকমর্দ সাহেবের সুযোগ্য শিষ্য তাঁর সমস্ত প্রতিভা ঢেলে দিয়েছেন। আমি মোগল সম্রাট হলে বলতাম— দাড়িপাল্লায় জয়নাল সাহেবকে তোেল। তাঁর ওজনের সমান। ওজন আশরাফি তাকে দাও এই সঙ্গে দুটা হাতি, একটা তরবারি এবং মণিমুক্ত বসানো পাগড়ি দিয়ে দাও। এখানেই শেষ না আরো বাকি আছে। একটা পরগনার জায়গীরদারিও তার। পরগনার নাম শিরশান্তি।
হিমু ভাই!
হুঁ।
আরাম পাচ্ছেন?
পাচ্ছি। চোখ মালিশ করবেন না?
চোখ মালিশ করলে ঘুমিয়ে পড়বেন এই জন্যে চোখ মালিশ করছি না। আমি আসলে আপনার মাথা মালিশ করছি ঘুম ভাঙানোর জন্যে।
সে কী!
আপনি গভীর ঘুমে ছিলেন। ঘুমন্ত মানুষের ঘুম চট করে ভাঙানো ঠিক না। এই জন্যে মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে ঘুম ভাঙাচ্ছি।
আমার ঘুম ভাঙানোটা কি প্রয়োজন?
জিনা প্রয়োজন নাই। একটা ঘটনা ঘটেছে। ভাবলাম আপনাকে বলি। মনটা খারাপ।
পরিচিত কেউ মারা গেছে?
জিনা।
তা হলে আর কি? চোখ মালিশ শুরু করে দিন। আমি ঘুমিয়ে পড়ি।
জি আচ্ছা।
চোখ মালিশ শুরু হতে হতে থেমে গেল। ঘটনাটা মনে হচ্ছে আমাকে শুনতেই হবে। অথচ চোখ মেলতে পারছি না।
হিমু ভাই!
বিলুন।
মনটা খারাপ। চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটেছে তো— এই জন্যে মনটা অত্যধিক খারাপ। চোখের সামনে না ঘটলে খারাপ লাগতো না। চোখের আড়ালে কত কিছুই ঘটে। ঠিক না?
অবশ্যই ঠিক? কথা বলার সময় মাথা মালিশ বন্ধ করে দিচ্ছেন কেন? নাপিত যেমন চুল কাটতে কাটতে কথা বলে— আপনিও তাই করুন— কথা এবং কাজ এক সঙ্গে চলুক।
ঘটনাটা বলব?
বলুন।
মনটা এত খারাপ হয়েছে ভাই সাহেব। তখনই বুঝেছি আজ। সারারাত আমার ঘুম হবে না।
ঘুম তো আপনার এম্নিতেই হয় না।
তাও ঠিক। কথার কথা বলেছি ভাই সাহেব। ঘটনাটা হল— আমাদের মেসের ম্যানেজার আবুল কালামকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে।
ও।
রাত এগারোটার সময় পুলিশ এসেছে। আমার সঙ্গে প্রথম দেখা। পুলিশ আমার সঙ্গে খুবই ভদ্রব্যবহার করেছে। জিজ্ঞেস করল, কালাম বলে কেউ আছে? আবুল কালাম? ভাবলাম বলি– না। না বলতে গিয়েছি মুখ দিয়ে সত্যি কথা বের হয়ে এল। পুলিশের সাথে মিথ্যা কথা বলা যেমন কঠিন। সত্যি কথা বলাও কঠিন। বললাম।— জি আবুল কালাম সাহেব অফিস ঘরে বসে আছে। তারপর নিজেই অফিস ঘর দেখিয়ে দিলাম।
ভাল করেছেন।
আমার চোখের সামনে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে দিল।
মারধোর করেছে?
মারধোর করে নাই। খুবই ভদ্রভাবে বলেছে— চলুন থানায় চলুন।
এটা দেখেই মন খারাপ হয়েছে?
পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। হ্যান্ডকাফ পরিয়ে থানায় নিয়ে যাচ্ছে আবার ভদ্র ব্যবহার করছে। এটা খুবই খারাপ লক্ষণ। আমি ভুক্তভোগী— আমি জানি।
আপনাকেও পুলিশ অ্যারেস্ট করেছিল?
জি। অনেক দিন আগের কথা। ঘটনাটা বলব?
বলতে চাইলে অবশ্যই বলবেন। তার আগে বলুন–আবুল কালামকে এ্যারেস্ট করেছে কেন?
কেউ কিছু জানে না ভাই সাহেব! কারোর জানার গরজও নাই। না থাকারই কথা। আমি একবার ভাবলাম থান ত গিয়া খোঁজ নিয়ে আসি। সাহসে কুলায় নাই। বাংলা একটা প্রবচন আছে না ঘরপুড়া গরু মেঘ দেখলে ভয় পায়।
