বছির বলে, “বড়লোকগো ঠগাও সেটা না হয় বুঝলাম কিন্তুক এইসব গরীব লোকগো ঠগায়া পয়সা আনা ত আমি ভাল বইলা মনে করি না।”
মজিদ উত্তর করে, “তুমি হাসাইলা বছির আমারে! এইসব লোকগো আমরা যদি না ঠগাই অন্যলোকে আয়া ঠগাবি। দিনে দিনে এরা ঠগতিই থাকপি। আমরা যদি এহন ওগো ঠগায়া লেহা-পড়া শিখতি পারি, আলেম ঐতি পারি, মৌলবী হয়া ওগো কাছে যায়া এমুন ওয়াজ করুম যাতে কেউ আর ওগো ঠগাইবার পারবি না।”
এ যুক্তিও বছিরের পছন্দ হয় না। এদেরই মত কত ছাত্র ত আলেম হইয়া গ্রাম-দেশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। তাহারা ত কেহই এইসব গ্রাম্য-লোকদিগকে শোষণের হাত হইতে বাঁচাইবার জন্য কোন বক্তৃতা করে না। বরঞ্চ আরও অভিনব মিথ্যার জাল পাতিয়া দেশের অজ্ঞ জনসাধারণকে ঠকাইয়া বেড়ায়। কিন্তু যে অসাধারণ অধ্যবসায়ের সহিত এই ছাত্র কয়টি পড়াশুনা করে তাহা দেখিয়া বছির বিস্মিত হয়। ওরা দুই তিনজন প্রায় গোটা কোরান শরীফখানিই মুখস্থ করিয়া ফেলিয়াছে। তাও কি শুধু মুখস্থই, কেরায়াত করিয়া কোরান শরীফ পড়িতে কোথায় স্বরকে বিলম্বিত লয়ে লম্বা করিতে হইবে, কোথায় খাটো করিতে হইবে, কোথাও থামিতে হইবে, উহার সব কিছু তাহারা মুখস্থ করিয়া আয়ত্ত করিয়া লইয়াছে। দিন নাই-রাত্র নাই–সকাল নাই–বিকাল নাই, অবসর পাইলেই ইহারা কেতাব লইয়া বসে। নিয়মিত খাওয়ার সংস্থান নাই, কতদিন অনাহারে কাটাইতে হয়। শীতে গরম বস্তু নাই। গ্রীষ্মের রৌদ্রে মাথার চান্দি ফাটিয়া যাইতে চাহে। প্রকৃতি ইহাদের কাছে দিনে দিনে নিষ্ঠুর হইতে নিষ্ঠুরতর হয়। তার উপর আছে অনাহারের ক্ষুধা,–সংক্রামক রোগের আক্রমণ! এই নিভকি জীবন যোদ্ধাগুলি দিনের পর দিন সকল রকম প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে সংগ্রাম করিয়া চলিতেছে।
পথ হয়ত ইহাদের ভ্রান্ত হইতে পারে। এই সংগ্রামের শেষ ফসলও হয়তো এই যুগোপযোগী হইয়া তাহাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে ধন-ধান্যে ভরিয়া দিবে না, কিন্তু এই জীবন্ত বিদ্যাসাগরেরা আমাদের পিছাইয়া পড়া মুসলিম সমাজে জ্ঞান-তপস্যার যে কঠোর সাধনা-ধারার আদর্শ রাখিয়া যাইতেছে তাহার প্রভাব কি আমাদের সমাজে পড়িবে না?
ছোট ছেলে বছির। অত শত ভাবিতে পারে না। কিন্তু মসজিদের এই তালেব-এলেমগুলির প্রতি একান্ত শ্রদ্ধায় তাহার মন ভরিয়া ওঠে। সেই শ্রদ্ধা প্রকাশ করিতে সে তাহাদের ঘর-সংলগ্ন পায়খানা ও প্রস্রাবখানার উপর বালতি বালতি পানি ঢালিয়া দেয়। দুই বেলা ঝাট দিয়া ঘরখানিকে পরিষ্কার করিয়া রাখে। তাহাদের ময়লা জামা-কাপড়গুলি ভাজ করিয়া সুন্দর করিয়া টাঙাইয়া রাখে। তাহারাও বছিরকে বড়ই স্নেহ করে। সকলেই অভাবী বলিয়া একে অপরের অভাব বুঝিতে পারে। কেহ বাড়ি হইতে সামান্য চিড়া বা মুড়ি লইয়া আসিলে সকলে মিলিয়া তাহা ভাগ করিয়া খায়।
মসজিদের খাদেম সাহেব এই তালেব-এলেমদিগকে পড়াইতে বিশেষ উৎসাহ দেখান । প্রায়ই নানা ওজর-আপত্তি দিয়া তিনি পড়াইবার সময় অন্য কাজ করেন। এজন্য তাহারা মনঃক্ষুণ্ণ হয় না। আরও মনোযোগের সহিত ওস্তাদের খেদমত করিয়া তাহারা তাহার অনুগ্রহ পাইতে চেষ্টা করে। যেখানে সেখানে ইমাম সাহেবের প্রশংসা করিয়া তাহার জন্য দাওয়াতের বন্দোবস্ত করে। তাহার গোছলের পানি, ওজুর পানি পুকুর হইতে আনিয়া কলসীতে ভরিয়া রাখে। তাহার জামাকাপড় সাবান দিয়া পরিষ্কার করিয়া দেয়। তিনি শুইয়া পড়িলে কেহ পাখার বাতাস করে, কেহ অতি যত্নের সঙ্গে তাহার পা টিপিয়া দেয়। তাহাদের ধারণা, ওস্তাদের সেবা করিয়া তাহার ভিতর হইতে বিদ্যা বাহির করিয়া লইতে হইবে। যখন তিনি তাহাদিগকে পড়াইতে কৃপণতা করেন, তাহারা আরও বেশী করিয়া তাহার খেদমত করে। এইভাবে প্রায় ছয় মাস কাটিয়া গেল। বছির আগের মতই স্কুলে যাইয়া পড়াশুনা করে।
মাঝে মাঝে আজাহের আসিয়া ছেলের খবর লইয়া যায়। বাড়ি হইতে গামছায় বাঁধিয়া কোনদিন সামান্য চিড়া বা ঢ্যাপের খই লইয়া আসে। মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে বছির সেগুলি কাড়াকাড়ি করিয়া খায়। দেখিয়া আজাহেরের বড়ই ভাল লাগে। আহা! যদি তার সঙ্গতি থাকিত সে আরও বেশী করিয়া চিড়া লইয়া আসিত। যত পারিত ওরা সকলে মিলিয়া খাইত।
ওদের খাওয়া হইলে আজাহের এক পাশে বসিয়া থাকে। তালেব-এলেমরা যার যার কেতাব লইয়া পড়িতে বসে। বছিরও জোরে জোরে তাহার বই পড়ে। আজাহের বসিয়া বসিয়া শোনে। এই পড়ার সুর যেন তাহার বুকের ভিতর হইতে বাহির হইতেছে। সেই সুরের উপর সোয়ার হইয়া আজাহের ভাসিয়া যায়। ছেলে মস্ত বড় বিদ্বান হইয়া শহরের কাছারিতে হাকিম হইয়া বসিয়াছে! কত উকিল, মোক্তার, আমলা, মুহুরি তাজিমের সঙ্গে তাহার সঙ্গে কথা বলিতেছে। এমন সময় আজাহের সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহার পরনে সেই ঘেঁড়া লুঙ্গি। গায়ে কত ধূলাবালি। ছেলে এজলাস হইতে নামিয়া আসিয়া তাহাকে উঠাইয়া লইয়া তাহার আসনের পাশে আনিয়া বসাইল। পায়ের ধূলী মাথায় লইয়া সমবেত উকিল, মোক্তারদিগকে বলিল, “এই যে আমার বাজান। আমার লেখাপড়ার জন্য ইনি কত অভাব-অভিযোগের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াছেন। নিজে অনাহারে থাকিয়া আমার পড়ার খরচ চালাইয়াছেন।” ‘না-না’ আজাহের কিছুতেই এইভাবে ছেলের সামনে যাইয়া উপস্থিত হইবে না। তাহা হইলে কি ছেলের মান থাকিবে? সে ছেলের উন্নতির জন্য যত ত্যাগ স্বীকার করিয়াছে তাহা চিরকালের জন্য যবনিকার অন্তরালে গোপন হইয়া থাকিবে! তাহার ত্যাগের জন্য সে কোনই স্বীকৃতি চাহে না। সকল বাপই ছেলের জন্য এইরূপ করিয়া থাকে। ছেলের উন্নতি হোক–ছেলের সম্মান বাড়ুক, দেশে বিদেশে ছেলের সুখ্যাতি ছড়াইয়া পড়ুক, তাই দেখিয়া আজাহের প্রাণ-ভরা তৃপ্তি লইয়া মাটির গোরে চিরজনমের মত ঘুমাইয়া পড়িবে!
