সেলিম তাকে সামনে এনে কোলে বসিয়ে বলল, স্বামীর জন্য যদি এত দরদ, তবে তাকে এত রাত জাগিয়ে রেখেছ কেন?
অন্যায় করেছি, তার জন্য আবার ক্ষমা চাইছি।
সেলিম বলল, মেয়েরা বেশ সুখে আছে। কোনো চিন্তা ভাবনা নেই, অন্যায় করলে মাফ চেয়ে খালাস। আজ কিন্তু মাফ করছি না। শাস্তি পেতেই হবে বলে তাকে দুহাতে তুলে নিয়ে খাটের দিকে এগোল।
লাইলী বলল, তুমি যত ইচ্ছা শাস্তি দাও। তোমার শাস্তি আমাকে যে কি আনন্দ দেয়, তা যদি জানতে, তা হলে………বলে তার বুকে মুখ লুকাল।
ওরে দুষ্ট মেয়ে, দাঁড়াও মজা দেখাচ্ছি বলে সেলিম তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আনন্দে মেতে উঠল।
এইভাবে খুব সুখের মধ্যে ওদের দিন কাটছিল। কিন্তু আল্লাহপাক সুখ দুঃখকে আলো ও অন্ধকারের মত পাশাপাশি রেখেছেন। কিছুদিন পর হঠাৎ লাইলীর ভীষণ জ্বর হল। জ্বরের ঘোরে সে ভুল বকতে শুরু করল, ‘আমি রেহানার কাছে অপরাধী।’ রেহানা সারাদিন তার কাছে থেকে সেবা শুশ্রুষা করে রাত্রে বাড়ি চলে যায়। সোহানা বেগম বড় ডাক্তার এনে চিকিৎসা করাতে লাগলেন। সেলিম আজ আট দিন স্ত্রীর কাছ থেকে উঠেনি। রেহানা জোর করে তাকে গোসল করতে ও খেতে পাঠায়। সেলিম সারারাত স্ত্রীর কাছে জেগে বসে থাকে। সোহানা বেগম ছেলেকে অনেক করে বোঝান, মানুষ মাত্রেই অসুখ বিসুখ হয়। তুই অত ভেঙ্গে পড়ছিস কেন? আল্লাহপাকের কাছে দোওয়া চা। সেলিম পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পর স্ত্রীর রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করতে লাগল। পনের দিন পর লাইলীর জ্বর একটু কমল।
।ডাক্তার বললেন, এবার আর ভয় নেই, রুগী এখন আউট অফ ডেঞ্জার। প্রতিদিন মনিরুল আসমাকে সঙ্গে করে লাইলীকে দেখতে আসে।
প্রায় এক মাস রোগ ভোগের পর লাইলী অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। এখন বালিশে হেলান দিয়ে বসতে পারে।
একদিন রেহানা যখন তাকে পথ্য খাওয়াচ্ছিল, তখন লাইলী তাকে বলল, তুমি মায়ের পেটের বোনের মত আমার সেবা করে আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছ। তোমার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।
রেহানা বলল, তোমার মতো বোন পেলে আমি ধন্য হয়ে যেতাম। আচ্ছা ভাবি, তুমি জ্বরের ঘোরে কেন বলতে, আমার কাছে তুমি অপরাধী?
লাইলী তাকে পাশে বসিয়ে বলল, জ্বরের মধ্যে কি বলেছি না বলেছি জানি না। এখন তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, কিছু মনে করবে না তো?
কি যে বল ভাবি, তোমার কথায় কিছু মনে করব এ কথা ভাবতে পারলে? তুমি কি বলবে বল, আমি কিছু মনে করব না।
লাইলী রেহানার দুটো হাত ধরে বলল, তোমাকে আমি ছোট জা করে সারাজীবন কাছে পেতে চাই। তুমি রাজি থাকলে বল, আমি সব ব্যবস্থা করব।
রেহানা মনে মনে খুব খুশি হল। কারণ সে লাইলীর সংস্পর্শে এসে ধর্মের অনেক জ্ঞান পেয়ে তার স্বভাব চরিত্রের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ভেবে দেখেছে নারী স্বাধীনতার নামে দিন দিন নারী সমাজ উচ্ছল হয়ে অধঃপতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই কারণে আরিফের দিকে তার মন ঝুঁকে পড়েছে।
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সাইলী বলল, কি হল? কথা বলছ না কেন?
ভাবি, তোমার কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কথা মনে পড়ে গেল। “মানুষ যা চায় তা পায় না। আর যা পায় তা ভুল করে চায়।” আমি তো তোমার কাছে জেনেছি, আল্লাহপাক প্রত্যেক নারীকে তার স্বামীর বাঁ দিকের পাঁজরা থেকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি যার সঙ্গে আমার জোড়া করেছেন, তার সঙ্গে বিয়ে হবেই। এখন এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।
ঠিক এই সময় সেলিম ঘরে ঢুকে রেহানার শেষ কথা শুনতে পেয়ে বলল, তোমার ভাবি বুঝি প্রশ্ন করছে, যার উত্তর দিতে পারছ না? ওর সঙ্গে কেউ তর্কে পারে না। কি প্রশ্ন করছে বল, দেখি আমি উত্তর দিতে পারি কি না।
রেহানা ভীষণ লজ্জা পেল। কিছু না বলতে পেরে তাড়াতাড়ি করে ঝুঁটো বাসন পত্র নিয়ে এস্তপদে পালিয়ে গেল।
সেলিম অবাক হয়ে তার চলে যাওয়া দেখল। তারপর খাটে লাইলীর পাশে বসে বলল, ওকে তুমি কি কথা জিজ্ঞেস করেছ? আমি জানতে চাইতে লজ্জা পেয়ে পালিয়ে গেল।
মৃদু হেসে লাইলী বলল, সে কথা তোমার এখন শুনে কাজ নেই, পরে এক সময় বলব।
দেখ স্বামীর অবাধ্য হলে কি হয়, তাতো জান।
লাইলী স্বামীর দুটো হাত ধরে বলল, তুমি রাগ করবে না তো?
সেলিম তার হাতটায় চুমো খেয়ে বলল, এই চুমোর কসম কিছু মনে করব না।
লাইলীও স্বামীর হাতে চুমো খেয়ে বলল, রেহানাকে আমার খুব পছন্দ। আর আরিফের সঙ্গেও খুব মানাবে। তার এতে মত আছে নাকি জিজ্ঞেস করছিলাম।
সেলিম কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল, রেহানা কি বলল? রেহানা যা বলেছে তার হুবহু বলে লাইলী বলল, আমার মনে হয় ও রাজি আছে।
সেলিম বলল, আরিফ যদি রাজি থাকে, তা হলে বেশ ভালই হবে। এবার থেকে ঘটকালির কাজ শুরু করলে তা হলে?
তাতো আপন জনের জন্য একটু আধটু সবাইকে করতে হয়।
এরপর থেকে রেহানা প্রতিদিন আসে না। মাঝে মাঝে আসে। একদিন লাইলী তাকে জিজ্ঞস করল, তুমি এখানে আসা কমিয়ে দিয়েছ কেন? সেদিনের কথায় মনে কি ব্যাথা পেয়েছ? যদি তাই হয়, তা হলে আমার কথা উইথড় করে নিচ্ছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও।
রেহানা বলল, ভাবি তোমার কথায় আমি মনে ব্যাথা পাইনি। শুধু শুধু তুমি ক্ষমা চাইছ কেন? তবে খুব লজ্জা পেয়েছি, তাই ঘনঘন আসতে মন চাইলেও আসতে পারিনি।
