মহসিনও শফির লাঠিখেলার কলাকৌশল দেখে মুগ্ধ হলেও তার প্রতি রেগে রয়েছে। তাই বলল, ওসব কথা বাদ দিয়ে চিন্তা কর শফিকে কীভাবে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া যায়।
চেয়ারম্যান বুঝতে পেরেছেন, শফির বিরুদ্ধে লাগা ঠিক হবে না। তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়াও সহজ হবে না। তাই বললেন, তুই অত মাথা গরম করছিস কেন? এখন আমাদেরকে ধৈর্য্য ধরে চিন্তা ভাবনা করে কাজ করতে হবে। জানিস না, ধৈর্যই সফলতার চাবি? এসব নিয়ে তুই কিছু ভাববি না, যা করার আমি করব। তুই কাল ঢাকায় চলে যাবি, মাথা ঠান্ডা রেখে গোছগাছ করে নিবি।
শফির অন্যান্য আত্মীয়দের সঙ্গে চাচা জাকির হোসেনও এসেছেন। সকলে চলে যাওয়ার পর জাকির হোসেন রয়েছে দেখে মাতব্বর তাকেও চলে যেতে বললেন, তারপর শফিকে নিয়ে বৈঠকখানায় বসলেন।
পর্দা করা জায়গায় শফির মা সাজেদা খাতুনও পাড়ার অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে লাঠিখেলা দেখতে এসেছিলেন। সবার মতো তিনিও জানতেন না, শফি মোবারক লেঠেলের সঙ্গে লড়বে। সবার শেষে যখন ঘোষক তার নাম ঘোষণা করলেন তখন শুনে ভয়ে চমকে উঠলেন। তারপর থেকে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে দোয়া করতে থাকেন, “আল্লাহ যেন শফিকে সফলতা দেন।” শফি জিতে যাওয়ার পরও চোখের পানি বন্ধ হয়নি। সেই অবস্থায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছেন। স্বামী চলে যাওয়ার পর ঘোমটা দিয়ে বৈঠকখানার একপাশে দাঁড়িয়ে শফি বলে ডেকে বললেন, আমার কাছে আয়।
শফি দ্রুত মায়ের কাছে এসে কদসবুসি করে বলল, তোমার দোয়ার বরকতে আল্লাহ আমাকে জয়ী করেছেন।
ছেলের কীর্তিকলাপ দেখে সাজেদা খুব অবাক হলেও বুক গর্বে ফুলে উঠেছে। কদমবুসি করতে তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমো খেয়ে বললেন, তুইও তো অনেক লাঠির বাড়ি খেয়েছিস। ঘরে চল, সেসব জায়গায় মলম লাগিয়ে দেব।
ওনার কথা মাতব্বর শুনতে পেয়েছেন। তাই শফি কিছু বলার আগে বললেন, শফির মা তুমি ঘরে যাও। ওর জন্য কোনো চিন্তা করো না। আমি একজনকে ডাক্তার নিয়ে আসতে পাঠিয়েছি। তা ছাড়া ওর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। তারপর তখনও যারা সেখানে ছিল তাদেরকে চলে যেতে বলে শফিকে বলল, তুমি আমার কাছে এসে বস।
কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তার এসে শফির আঘাত পাওয়ার জায়গাগুলো পরীক্ষা করে বললেন, তেমন গুরুতর কিছু নয়। তারপর প্রেসক্রীপসান করে দিয়ে বললেন, মলমটা ফুলে উঠা জায়গাগুলোতে লাগাবেন আর ওষুধগুলো ঠিকমতো খাবেন। তারপর বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর মাতব্বর শফিকে বললেন, ঘরে গিয়ে ফ্রেস হয়ে আসরের নামায পড়ে এস, একটা ব্যাপারে আলাপ করব। আমি ওষুধ কিনতে লোক পাঠিয়েছি। তখন ওগুলো নিয়ে যাবে।
ঘরে আসার পথে হঠাৎ রবিউলের কথা শফির মনে পড়ল। প্রতিযোগীতায় নামার আগে শফি তার চোখের আড়ালে ছিল। প্রতিযোগীতা শেষ হবার পর যখন সবাই তাকে হাততালি দিয়ে বাহবা দিচ্ছিল তখন রবিউলকে দেখতে না পেয়ে ভাবল, ওকে এ ব্যাপারে কিছু জানাইনি বলে নিশ্চয় আমার উপর খুব রেগে আছে। কথাটা ভেবে ঘরে না গিয়ে ওর কাছে যেতে লাগল। রবিউলের ঘরের কাছে এসে তাদের কাজের ছেলেটাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, রবিউল ঘরে আছে?
কাজের ছেলেটা শফিকে চেনে। বলল, জ্বি আছে। লাঠিখেলা দেখে কিছুক্ষণ আগে ফিরেছে। আপনি সদরে বসুন ডেকে দিচ্ছি।
শফি বলল, বসার সময় নেই, তুমি ওকে তাড়াতাড়ি ডেকে দাও।
একটু পরে রবিউল এলে শফি সালাম দিয়ে বলল, ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে এলাম।
রবিউল সালামের উত্তর দিয়ে চুপ করে রইল।
কী রে, ক্ষমা চাইলাম, তবু ক্ষমা করবি না? জানিস না বুঝি ক্ষমাকারীকে আল্লাহ খুব পছন্দ করেন?
তা জানব না কেন? কিন্তু তুই তো নিজেই বললি ইচ্ছাকৃত ভুল করেছিস। কেউ না জেনে ভুল করলে তাকে ক্ষমা করা যায়; কিন্তু…….
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে শফি বলল, মোবারক লেঠেলের সঙ্গে লড়াই করব একথা তোকে কেন বলিনি জানিস? বললে তুই লড়তে দিতিস না।
তোর ধারণা ভুল। আমি এতটুকু বাধা দিতাম না। কারণ আমি হ্যাঁন্ড্রেড পার্সেন্ট সিওর, যে কাজে তুই নামবি, তাতেই তুই সাকসেসফুল হবি। তবু তর্কের খাতিরে না হয় তোর কথা মেনেই নিলাম; কিন্তু মাতব্বরের সঙ্গে প্রতিযোগীতার প্ল্যান প্রোগ্রাম করেছিস, সেকথা জানালি না কেন? সেটাতেও বাধা দিতাম?
দিতিস না বলে শফি তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, এ ভুল আমি অজান্তে করেছি। দু’টো ভুল একসঙ্গে ক্ষমা করে দে। যদি না করিস, তা হলে তোর মনে যতটা কষ্ট হয়েছে তার চেয়ে বেশি আমার মনে কষ্ট হবে।
রবিউল নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে বলল, আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুক। তারপর বলল, ঘরে চল, নাস্তা খেয়ে যাবি।
শফি বলল, গোসল না করে এ অবস্থায় খেতে পারব না। তা ছাড়া প্রতিযোগীতার পর মায়ের সঙ্গে দেখা হলেও দাদির সঙ্গে হয়নি। জানিসতো উনি খুব পর্দা মেনে চলেন। উনি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। এখন যাই, কাল সকালে আসব। তারপর বিদায় নিয়ে চলে গেল।
জমিলা খাতুন খুব পর্দানশীন মহিলা। তাই তিনি প্রতিযোগীতা দেখতে যাননি। কিছুক্ষণ আগে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মুখে শফি লেঠেলসর্দার মোবারকের সঙ্গে প্রতিযোগীতায় নেমে তার একটা হাত ভেঙ্গে দিয়েছে শুনে খুব খুশি হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছেন। এখন শফিকে ঘরে ঢুকতে দেখে তবু জিজ্ঞেস করলেন, তুই নাকি মোবারক লেঠেলের সঙ্গে লড়াই-এ নেমে তার একটা হাত ভেঙ্গে দিয়েছিস?
