ঢাকার রাজারবাগ ও পিলখানায় এবং চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানী বাহিনী যথাক্রমে বাঙালী পুলিশ, ইপিআর এবং ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ (ইবিআর)-এর সৈন্যদের পাইকারীভাবে হত্যা করতে শুরু করেছে এই সব সংবাদ আগুনের মত সারা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্রবাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী অংশ আত্মরক্ষা ও দেশাত্মবোধের মিলিত তাগিদে, উচ্চতর রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারো আহ্বান ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই, বিদ্রোহ শুরু করে।
এর ফলে সেনাবাহিনীর নির্মম ও সর্বাত্মক আক্রমণের মাধ্যমে মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানী কর্তৃত্ব পুনঃপ্রবর্তনের যে পরিকল্পনা টিক্কা খানের ছিল, তা বহুলাংশে ব্যর্থ হয়। সশস্ত্রবাহিনীর বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহ এবং উদ্ভুত খণ্ডযুদ্ধের মধ্যে চট্টগ্রামস্হিত ৮ইবি ও ইপিআর বাহিনীর সশস্ত্র প্রতিরোধ একটি বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য। স্বল্পকালের জন্য চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র যখন বিদ্রোহীদের দখলে আসে, তখন ২৬শে মার্চ
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান এবং ২৭শে মার্চ সন্ধ্যায় ৮ইবির বিদ্রোহী নেতা মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে ঘোষণা করলেও, পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন। এই সব ঘোষণায় বিদ্যুতের মত লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, শেখ মুজিবের নির্দেশে সশস্ত্রবাহিনীর বাঙালীরা স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই শুরু করেছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বেতারের এই সব ঘোষণার পিছনে না ছিল এ ধরনের রাজনৈতিক অনুমোদন, না ছিল কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি।
অন্যদিকে পাকিস্তানী বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, বেপরোয়া গোলাগুলি ও অগ্নি সংযোগের মুখে রাজনৈতিক নেতা, কর্মী এবং সশস্ত্রবাহিনীর বিদ্রোহী বাঙালীরা তো বটেই, বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষও নিরাপত্তার সন্ধানে শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিতে শুরু করে, প্রথমে হাজারের অঙ্কে, পরে লক্ষের–বিরামহীন, বিরতিহীন। এমনিভাবে পাকিস্তানের আঞ্চলিক বিরোধ ও গৃহযুদ্ধের সাথে ভারত ক্রমশ জড়িত হয়ে পড়ে এই ভীত সন্ত্রস্ত শরণার্থীদের জোয়ারে। চৌদ্দশ’ মাইল হল-সীমান্ত বিশিষ্ট কোন অঞ্চলের উপর যে ইন্দোনেশীয় সেনাবাহিনীর পরীক্ষিত ‘সমাধান’ চাপিয়ে দেয়া যায় না, এই উপলব্ধি টিক্কা খানের পরিকল্পনায় ছিল মর্মান্তিকভাবেই অনুপস্থিত। পূর্ব বাংলার এই অনন্য ভূরাজনৈতিক অবস্থানের জন্য একদিকে যেমন পাকিস্তানী আক্রমণ ঈপ্সিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়, তেমনি অন্যদিকে আক্রান্ত পূর্ববঙ্গবাসীদের স্বতঃস্ফুর্ত সংগ্রাম ক্রমশ এক সফল মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়।
সামরিক আক্রমণের অবর্ণনীয় ভয়াবহতার ফলে সাধারণ মানুষের চোখে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও আদর্শগত অস্তিত্বের অবশিষ্ট যুক্তি রাতারাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই ভয়াবহতা থেকে উদ্ধার পাওয়ার একমাত্র উপায় হিসাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম অধিকাংশ মানুষের নৈতিক সমর্থন লাভ করে। আর যারা আক্রান্ত অথবা বিশেষ আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত হয়, তারা অচিরে জড়িয়ে পড়ে প্রতিরোধের লড়াইয়ে। ২৬শে মার্চের পর থেকে প্রথম দশ দিনের মধ্যেই এই প্রতিরোধ সংগ্রামের নেতৃত্বে তিনটি স্বতন্ত্র উদ্যোগ পরিস্ফুট হয়।
প্রথম উদ্যোগ ছিল আক্রান্ত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআর-এর সেনা ও অফিসারদের সমবায়ে গঠিত। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সকল বাঙালী সৈন্য ও অফিসারই যে এতে যোগ দিয়েছিল তা নয়। অনেকে নিরস্ত্ৰকৃত হয়েছে, অনেকে বন্দী হয়ে থেকেছে, আবার অনেকে শেষ অবধি পাকিস্তানীদের পক্ষে সক্রিয় থেকেছে। বিদ্রোহ ও প্রতিরোধ যুদ্ধে ইপিআরদের অংশগ্রহণ বরং ছিল অনেক বেশী ব্যাপক ও স্বতঃস্ফুর্ত। যেমন ছিল বাঙালী পুলিশদের। মেজর জিয়ার ঘোষণা এবং বিদ্রোহী ইউনিটগুলির মধ্যে বেতার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হবার ফলে এই সব স্থানীয় ও খণ্ড বিদ্রোহ দ্রুত সংহত হতে শুরু করে। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধে জড়িত হবার বিষয়টি এদের জন্য মুখ্যত ছিল অপরিকল্পিত, স্বতঃস্ফুর্ত এবং উপস্হিত সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এই যুদ্ধের রাজনৈতিক উপাদান সম্পর্কে এদের অধিকাংশের জ্ঞানও ছিল সীমিত। তবু বিদ্রোহ ঘোষণার সাথে সাথে পাকিস্তানী বাহিনী সীমান্ত পর্যন্ত এমনভাবে এদের তাড়া করে নিয়ে যায় যে এদের জন্য পাকিস্তানে ফিরে আসার পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়। হয় ‘কোর্ট মার্শাল’ নতুবা স্বাধীনতা–এই দুটি ছাড়া
অপর সকল পথই তাদের জন্য বন্ধ হয়ে পড়ে। এমনিভাবে পাকিস্তানী আক্রমণের এক সপ্তাহের মধ্যে স্বাধীনতার লড়াইয়ে শামিল হয় প্রায় এগারো হাজার ইবিআর এবং ইপিআর-এর অভিজ্ঞ সশস্ত্র যোদ্ধা–কখনও কোন রাজনৈতিক আপোস-মীমাংসা ঘটলেও দেশে ফেরার পথ যাদের জন্য ছিল বন্ধ, যতদিন না বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানীরা সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত হয়।