কোথায়? চলই না দেখবেখন। আচ্ছা সুব্রত গত রাত্রের ঘটনা সম্পর্কে তোমার নিজস্ব মতামত কী।
গত রাত্রে ঘটনাটা যে আমি তেমন বুঝে উঠতে পেরেছি একথা বললে সম্পূর্ণ মিথ্যা কথাই বলা হবে কিরীটী। তাছাড়া আমার যেন কেমন সন্দেহ হয়, গত রাত্রের ঘটনার মধ্যে এমন কোন একটা ব্যাপার সত্যিই লুকিয়েছিল যা হয়তো আমাদের কারও নজরে পড়েনি এবং অনেক ঘটনাই থাকা সম্ভব যা কারও নজরে পড়ছে না। আপাততঃ।
তাহলে নিশ্চয়ই এমন ধরনের কোন একটা ব্যাপার তোমার মনে উকি দিয়েছে সুব্রত কালকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে—বল না-বলছি না কেন?
কাল রাত্রে মিঃ মিত্রের হত্যা সম্পর্কে যাদের জেরা করা হয়েছিল তাদের মধ্যে দুজন বলেছেন—একজন বিকাশ মল্লিক, আর একজন অরুণ কর, যে মিঃ শুভঙ্কর মিত্র হিন্দী ভাষা জানতেন; লিখতে, পড়তে বলতে র্তর আটকাত না। প্রফেসার কালিদাস শর্মাকেও তুমি ঐ কথা জিজ্ঞাসা করেছিলে, কিন্তু তিনি স্পষ্টই বললেন, শুভঙ্করবাবুর হিন্দী-জ্ঞান ‘করেঙ্গ’ ‘খায়েঙ্গার বেশী নয়। অর্থাৎ তার মতে মিঃ মিত্রের হিন্দী-জ্ঞান আমাদেরই মত। এদের মধ্যে হয়। অরুণ ও বিকাশবাবু, নয় প্রফেসর শর্মা মিথ্যে কথা বলেছেন নিশ্চয়ই!
চমৎকার! বাঃ সুব্রত, সত্যই আমি দেখে সুখী হয়েছি যে দিন দিন তোমার দেখবার ও বোঝবার শক্তি প্রখর হয়ে উঠছে। তুমি একদিন সত্যিকারের রহস্যভেদী হতে পারবে বন্ধু-কিন্তু এবার বল তো বন্ধু আমার, সত্যিই যদি তোমার মতে ওদের কেউ একজন মিথ্যা কথাই বলে থাকে—কেন, কী কারণে সে মিথ্যা বললে? উদ্দেশ্য কী ছিল তারা?
কী জানি ভাই, তা তো বলতে পারছি না! সত্যি সত্যি একজন ভদ্র ব্যক্তি কি করে যে মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারেন তা সহজ বুদ্ধির বাইরে। তবে আমার যা মনে হয়েছে তাই বললাম।
কিন্তু তোমার মনে হয় কি কে এদের মধ্যে মিথ্যা কথা বলতে পারে বন্ধু?
মনে হয় প্রফেসারই যেন মিথ্যা কথা বলেছেন। তারপর ধর, হিন্দী ভাষায় অনুদিত সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে বইখানা…
চমৎকার! সত্য সত্যই যে সুব্রত তুমি ভাবতে শিখেছি! বল বল! কিরীটী উৎসাহিত হয়ে ওঠে।
দেখ আমার অনুমান হয়, কুমারসাহেবের বাড়ির খাবার ঘরটায় গতরাত্রে আমন্ত্রিত অভ্যাগতদের মধ্যে বলতে গেলে কেউই একপ্রকার ঢোকেননি। কেননা খাবার বন্দোবস্ত গতরাত্রে নীচের হলঘরেই হয়েছিল এবং সে অবস্থায় দু-একজন কেউ সে ঘরে ঢুকলেও পাশের ঘরে যে বাবুর্চি ছিল তার নজরে পড়ত; আর হয়েছিলও তাই। শুভঙ্করবাবু যখন খাবার ঘর থেকে বের হয়ে যান, বাবুর্চি দেখেছিল। সেখানে এমন বেশী লোক থাকতে পারে না যারা হিন্দীতে অনূদিত বই পড়তে সক্ষম। তাছাড়া সকলেই একবাক্যে অস্বীকার করেছেন, ও বইটা সম্পর্কে কেউ কিছু জানেন না। অথচ প্রফেসার ও শুভঙ্করবাবু দুই বন্ধু খাবার ঘরে অনেকক্ষণ উপস্থিত ছিলেন। আমার যতদূর মনে হয় শুভঙ্করবাবুই নিজে ঐ বইখানা খাবার ঘরে একটা চেয়ারের ওপর ভুলে ফেলে আসেন এবং অরুণ করের সঙ্গে দেখা করবার সময় ঐ বইখানা নিয়ে যেতেন, অরুণ করাকে উত্তেজিত করে মজা দেখবার জন্য; কেননা অরুণ কর হিন্দী ভাষা মোটেই পছন্দ করে না। সে যাই হোক, আমি এখনো বুঝে উঠতে পারছি না, সত্যি ব্যাপারটা যদি আমার অনুমান মতই হয়ে থাকে, তবে প্রফেসার শৰ্মা কেন বললেন না যে শুভঙ্কর মিত্ৰই বইখানা ঐ ঘরে ফেলে গিয়েছিলেন!
তাছাড়া আরও ভেবে দেখ, সত্যিই যদি মিঃ মিত্ৰই বইখানা সে ঘরে ফেলে গিয়ে থাকেন প্রফেসর শর্মা নিশ্চয় তা জানতেন, কিন্তু তিনি তা স্বীকার করলেন না, কিংবা এমনও হতে
কিরীটী কোন জবাব দিল না। চুপ করে রইল। একটু পরে বললে, দেখ সুব্রত, আমরা যতদূর জানি ও শুনেছি শুভঙ্করবাবু একটুও ঘোর-পাঁচের লোক ছিলেন না। কিন্তু ঘটনাগুলো পর পর এমন ভাবে দাঁড়াচ্ছে যে, লোকটা অত্যন্ত প্যাচোয়া ছিলেন মনে হচ্ছে। আপাততঃ চল, একবার দীনতারণ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করে আসি।
বেশ চল।
দুজনে আমরা উঠে দাঁড়ালাম।
১০. টালিগঞ্জেই দীনতারণ চৌধুরীর বাড়ি
টালিগঞ্জেই দীনতারণ চৌধুরীর বাড়ি।
ফটকওয়ালা একটা দোতলা বাড়ি। সামনেই গেটে কালো পাথরের ওপর সোনার জলে দীনতারণ চৌধুরীর নাম লেখা।
Mr. D. C. Chowdhury
M. A. Bar-at-law.
ছোটখাটো একটা ফুলের বাগান, তারপরই বৈঠকখানা। দীনতারণবাবু বৈঠকখানা ঘরেই টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে একরাশ কাগজপত্র চারপাশে ছড়িয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে যেন কি সব দেখছিলেন। মাঝারি গোছের দোহারা চেহারা, গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, মাথা ভর্তি সুবিস্তীর্ণ টাকা চকচক করছে। চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা।
আমাদের পদশব্দে চোখ তুলে চাইলেন, কী চাই? কে আপনারা?
সুপ্রভাত। আমরা বোধ হয় মিঃ চৌধুরীর সঙ্গেই কথা বলছি! কিরীটী বললে।
হ্যাঁ, বসুন। আপনারা?
আমার নাম কিরীটী রায়; আর ইনি আমার বন্ধু ও সহকারী সুব্রত রায়। আমরা গতরাত্রে কুমারসাহেবের সেক্রেটারীর হত্যার ব্যাপারে প্রাইভেট তদন্তভার নিয়েছি।
ও বেশ, নমস্কার। আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সুখী হলাম। আজ সকালের কাগজেই কুমারসাহেবের সেক্রেটারীর নিষ্ঠুর হত্যা ব্যাপার সম্পর্কে পড়েছি, ভাবছিলাম আর একটু বেলায় কুমারসাহেবের সঙ্গে একবার দেখা করতে যাব। তারপর একটু থেমে আবার বললেন, আমার অনুমান যদি ভুল না হয়ে থাকে, তবে নিশ্চয়ই আপনারা মিঃ শুভঙ্কর মিত্রের হত্যা সংক্রান্ত কোন কিছুর সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই আমার এখানে এসেছেন মিঃ রায়!
