কিরীটী সোজা সেই খোলা জানলাটার সামনে এসে দাঁড়াল; সামনেই অন্দর ও সদরের সংযোগস্থলে সেই আঙিনা চোখে পড়ে। কিরীটী আশেপাশে বাইরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে সহসা তার দুটো যেন ঈষৎ কুঞ্চিত হয়ে ওঠে এবং সঙ্গে সঙ্গেই সরল হয়ে আসে চোখের দৃষ্টিটা, যেন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মৃত্যুর সমস্ত সমাধানই যেন মুহূর্তে তার চোখের সামনে অন্ধকারে বিদ্যুৎ-ঝলকের মত প্রকটিত হয়ে ওঠে। চোখ ফিরিয়ে সে আবার মৃতদেহের উপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। লাহিড়ীর মৃত্যু-ব্যাপার ঠিক সুব্রতর চিঠিতে যেমনটি সে লিখেছিল এ ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই একটি তীর নিশানাথের বুকে বিদ্ধ হয়ে আছে। হত্যাপদ্ধতি যখন দুক্ষেত্রে অবিকল এক—একই গৃহে এবং রাত্রের অন্ধকারে, তখন কিরীটীর বুঝতে বাকি থাকেনা, লাহিড়ীও নিশানাথের হত্যাকারী একইলোক। নিশানাথ সম্পর্কে সুব্রতর অনেকগুলো কথা চিঠির অক্ষরে ওর মনের পাতায় যেন ছায়াছবির মত একটার পর একটা ভেসে যায়।
মৃতদেহ দেখা হয়ে গেছে বিকাশবাবু। ওপরে রাজাবাহাদুরের বসবার ঘরে চেয়ারের ওপরে আমার সিগার কেসটা ভুলে ফেলে এসেছি, যদি অনুগ্রহ করে নিয়ে আসেন। হঠাৎ কিরীটী বলল।
বিকাশ কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে যেতেই বেশ অনুচ্চ কণ্ঠে কিরীটী বললে, রাজাবাহাদুর, একটা কথা, আপনার কাকা নিশানাথ মল্লিক ও আপনার ম্যানেজার সতীনাথের হত্যাকারী কে সত্যিই কি জানবার জন্য আগ্রহী?
সুবিনয় যেন কিরীটীর কথায় প্রথমটা হঠাৎ চমকে ওঠেন, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, এ-কথার মানে কি অর্জুনবাবু? আপনি কি বলতে চান?
আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এমনও তো হতে পারে ঐ দুটি হত্যারহস্যের মূল খুঁজে বের করতে গেলে হয়ত যাকে বলে আমাদের কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে গোখরো সাপ গর্ত থেকে বের হয়ে আসা—ভাবছি, সত্যিই যদি তেমন কিছু ঘটে, তাহলে সাপের সে ছোবল সামলাবার মত সকলেই নীলকণ্ঠ কিনা।
ইন্সপেক্টার, আপনি ভুলে যাবেন না কার সামনে দাঁড়িয়ে আপনি কথা বলছেন। তাছাড়া আমি আপনার পরিহাসের পাত্র নই। খুনের তদন্ত করতে এসেছেন তাই করুন এবং যদি তদন্ত শেষ হয়ে গিয়ে থাকে, আমি এবারে আপনাদের যেতে বলব, কারণ রাত্রি অনেক হয়েছে। আমি অত্যন্ত পরিশ্রান্ত। রাজাবাহাদুর যেন একটু রুক্ষ গলায় ঐ কথাগুলো বললেন।
বিকাশ এসে কক্ষে প্রবেশ করল, হাতে তার কিরীটীর সুবর্ণনির্মিত সিগারকেসটি।
বিকাশের হাত হতে সিগার-কেসটি নিয়ে কিরীটী একটি সিগারে অগ্নিসংযোগ করে খানিকটা ধোঁয়া উদগীরণ করে বললে,চলুন বিকাশবাবু, রাত্রি অনেক হল। এই ঘরে একটা তালা দিয়ে চাবিটা নিয়ে চলুন, সকালে মৃতদেহটা ময়না তদন্তের ব্যবস্থা করবেন। আচ্ছা আসি তাহলে, নমস্কার রাজাবাহাদুর।
দুজনে উঠে দাঁড়াল
২.০৮ জবানবন্দির জের
রাস্তায় চলতে চলতে কিরীটী কিছু কিছু বাদ দিয়ে আনুপূর্বিক সমস্ত কথা বিকাশকে বলে গেল। বললে, রায়পুর-হত্যারহস্য যতটুকু জট পাকাবার তা পাকিয়েছে বিকাশবাবু, এবারে সেই জট আমাদের একটি একটি করে খুলতে হবে। রায়পুর রাজপরিবারের পুরাতন ইতিহাস, মনে হচ্ছে সে যেন একখানি উপন্যাস। যার কিছুটা আজ আপনি রাজাবাহাদুরের মুখে শুনলেন, বাকিটা আমি যা খোঁজ করে জেনেছি তা এই— আপনি শুনলেন, শ্ৰীকণ্ঠ মল্লিকরা ছিলেন তিন ভাই, জ্যেষ্ঠ শ্রীকণ্ঠ, মধ্যম সুধাকণ্ঠ ও কণিষ্ঠ বাণীকণ্ঠ। এঁদেরই পিতা ছিলেন রাজা রত্নেশ্বর মল্লিক। রত্নেশ্বরের পিতার আমলে একটা খুনের মামলায় এঁদের সম্পত্তি প্রায় যায় যায় হয়েছিল, সেই সময় যিনি তাঁর প্রাণ দিয়ে সকল অপরাধ নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে এঁদের পূর্বপুরুষকে বাঁচিয়েছিলেন, সেই তিনিই হচ্ছেন এঁদের পূর্বতন নায়েবজী শ্রীনিবাস মজুমদারের পিতামহ। রত্নেশ্বরের পিতা অকৃতজ্ঞছিলেন না, তাই হয়ত এর প্রতিদানেনৃসিংহগ্রাম মহালটির অর্ধাংশ মজুমদার বংশকে লেখাপড়া করে দিয়ে যান। পরে অবিশ্যি আবার শোনা যায় রত্নেশ্বর সে অংশটুকু কিনে নেন নামমাত্র মূল্য দিয়ে, বলতে পারেন কতকটা মজুমদার মশাইকে বিক্রি করতে বাধ্য করেছিলেন রত্নেশ্বর এবং অর্থের লোভে পিতার ঋণ তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেন।
হয়ত মল্লিক বংশের ধ্বংসের মৃত্যুবীজ সেই দিনই সবার অলক্ষ্যে রোপিত হয়েছিল অলঙঘ নির্দেশে এবং ক্রমে একদিন সেই বিষই এদের পুরুষানুক্রমে রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। সত্যি কি মিথ্যা জানি না, হারাধন মল্লিক বলেন রত্নেশ্বরই নাকি তাঁর বৃদ্ধ পিতাকে দুধের সঙ্গে বিষপ্রয়োগে হত্যা করেন। কিন্তু দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ হয়ে জন্ম নিলেন রত্নেশ্বরের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীকণ্ঠ মল্লিক। তিনি দুই পুরুষ আগেকার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইলেন, কিন্তু তাঁর সে মনস্কামনা পূর্ণ হবার আগেই নিজ বংশের বিষের ক্রিয়ায় জর্জতির হয়ে ছটফট করতে করতে তিনি মৃত্যুকে বরণ করলেন। সংক্রামক ব্যাধির মতই পাপের বিষ তখন এদের বংশকে বিষাক্ত করে ফেলেছে, অনিবার্য ধ্বংসের দিকে তখন এঁরা ছুটে চলেছে নিষ্ঠুর নিয়তির এক অলঙ্ঘ্য নির্দেশে। রায়পুর রাজবংশের এক করুণ অধ্যায়ের সূচনা শুরু হয়ে গিয়েছে।
আপনার কি মনে হয় কিরীটীবাবু, শ্ৰীকণ্ঠ মল্লিকের হত্যা, সুধীনের পিতার হত্যা, সতীনাথের হত্যা, নিশানাথের হত্যা সব একই সূত্রে গাঁথা? প্রশ্ন করে বিকাশ।
