একটা মজার ঘটনা মনে পড়ছে।
কৃষ্ণ মেননের সঙ্গে জেনেভা এয়ারপোর্টে নামতেই দেখি, সংবাদপত্র, রেডিও ও টি. ভি-র বহু সাংবাদিক ওর জন্য অপেক্ষা করছেন। প্রথমে দুটো-একটা টিকা-টিপ্পনী, হাসি-ঠাট্টা। শেষ পর্যন্ত শুরু হল সাংবাদিক সম্মেলন। বহু বিষয়ে বহু প্রশ্ন। মুহূর্তের মধ্যে জবাব। আমি সাংবাদিক সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করছি না কিন্তু মেননের পিছনে বসে সবকিছু উপভোগ করছি।
যে সময়ের কথা বলছি তখন শুধু কয়েকটি পাশ্চাত্য দেশ ও সোভিয়েট ইউনিয়নেরই আণবিক-পারমাণবিক অস্ত্র ছিল। এশিয়ার একটা বিশেষ দেশের সাংবাদিক হঠাৎ মেননকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কী মনে করেন আণবিক বা পারমাণবিক অস্ত্র শুধু আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু দেশের একচেটিয়া অধিকার?
মেনন জানতেন ঐ সাংবাদিকটির দেশও আণবিক অস্ত্র তৈরির ব্যাপারে গোপনে গোপনে কাজ করছে এবং ভারত কোন কারণেই আণবিক অস্ত্র বানাবে না। তাই মেনন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, No, nover. Only American and European countries cant have monopoly over prostitution. There must be prostitutes from your country to break their monopoly.
হাসিতে ফেটে পড়লেন দুনিয়ার সাংবাদিকরা, মুখ চুন করে মাথা হেঁট করে বসে রইলেন ঐ সাংবাদিক।
কৃষ্ণ মেননের কথাবার্তার ধরণই ছিল এই রকম। যেমন বুদ্ধি, তেমনি পাণ্ডিত্য। সেই সঙ্গে বিতর্ক করার অসাধারণ ক্ষমতা। পেঙ্গুইনের অন্যতম প্রথম সম্পাদক, কোরিয়া ও ইন্দো-চায়না সমস্যা সমাধানের প্রধান ব্যক্তি, স্বাধীন সার্বভৌম সাইপ্রাসের স্রষ্টা কৃষ্ণ মেনন সত্যি অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন। সাইপ্রাসের কথা বলতেই মনে পড়ে কত কি।
সাইপ্রাস তখন সারা দুনিয়ার সংবাদপত্রের শিরোনাম। বিশ্বের নানা রাজধানীতে সাইপ্রাসের ভবিষ্যত নিয়ে নিত্য আলোচনা। ইউনাইটেড নেশন-এ বিতর্ক হয় কিন্তু তুরস্ক ও গ্রীসের পারস্পরিক ঈর্ষা ও দ্বন্দ্বের জন্য সমস্যার সমাধান হয় না। গ্রীস বলে, যে দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রীক বংশোদ্ভুত, সে দেশে আমাদের অধিকার চাই। পাল্টা দাবী করে তুরস্ক–সাইপ্রাস তো আমাদেরই অটোম্যান সাম্রাজ্যের মধ্যে ছিল। সুতরাং সাইপ্রাসে আমাদেরই আধিপত্য থাকতে হবে। সমাধান? দেশকে দু টুকরো কর।
না, তা হতে পারে না। রাষ্ট্রপুঞ্জে গর্জে উঠলেন কৃষ্ণমেনন। আঞ্চলিক ভিত্তিতেই দেশ গড়ে ওঠে, সে দেশের মানুষ অতীতে কোন্ দেশের লোক ছিল, তা কোন বিবেচনার বিষয় নয়। পৃথিবীতে এমন কোন দেশ আছে যেখানে অন্য দেশের মানুষ এসে দীর্ঘকাল ধরে বাস করে না? দশ দেশের মানুষ নিয়েই প্রতিটি দেশ গড়ে উঠেছে কিন্তু তাই বলে কোন দেশকেই দশ ভাগে ভাগ করা হয় না। গ্রীক বা তুরস্ক-যে দেশের মানুষই হোক, যারা সাইপ্রাসে বাস করে তারাই সাইপ্রাসের অধিবাসী। নাগরিক। সাইপ্রাস দ্বিখণ্ডিত হতে পারে না–হবে না। স্বাধীন সার্বভৌম সাইপ্রাসের জন্মই সব সমস্যার সমাধান করবে।
ভারতের প্রতিনিধি ও নেহরুর দূত কৃষ্ণমেননের এই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই জন্ম নিল সাইপ্রাস। ভূমধ্যসাগরের কোলে অবর্ণনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই দেশ প্রতিষ্ঠিত হল বিপ্লবী ম্যাকারিয়সের নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম সাইপ্রাস সরকার। মনে পড়ছে প্রেসিডেন্ট ম্যাকারিয়সের কথা। প্রথম গোষ্ঠী নিরপেক্ষ সম্মেলন কভার করার জন্য আমি চলেছি বেলগ্রেড। গভীর রাতে দিল্লী থেকে বেইরুট পৌঁছলাম বি-ও-এ-সি প্লেনে। এক দিন ওখানে কাটিয়ে ব্রিটিশ ইউরোপীয়ন এয়ারওয়েজের প্লেনে রওনা হলাম গ্রীসের রাজধানী এথেন্স। মাঝপথে বিমানটি অপ্রত্যাশিতভাবে নামল সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোশিয়ায়। আরো বেশি অবাক হলাম রাষ্ট্রপতি আর্চবিশপ ম্যাকারিয়াকে আমাদের প্লেনেরই যাত্রী হতে দেখে।
নিকোশিয়া থেকে প্লেন টেক অফ করার পরই প্রথমে এয়ার হোস্টেস, পরে ক্যাপ্টেনের মারফত প্রেসিডেণ্ডের সেক্রেটারির কাছে আমার ভিজিটিং কার্ড পাঠিয়ে অনুরোধ জানালাম, রাষ্ট্রপতির দর্শন চাই। কয়েক মিনিট পরেই তদানীন্তন বিদেশ মন্ত্রী ও বর্তমানের রাষ্ট্রপতি কিপ্রিয়ানউ এসে জানালেন, হাতের কাজ শেষ হলেই প্রেসিডেন্ট আপনাকে ডেকে পাঠাবেন।
হ্যাঁ, কয়েক মিনিট পরেই খ্রীষ্টীয় ধর্মযাজক ও বিপ্লবী বীরের দেখা পেলাম। পৃথিবীর বহু দেশের বহু নেতার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রপতি আর্চবিশপ মাকারিয়সের কাছে যে সম্মান, যে ভালবাসা, যে আন্তরিকতা পেয়েছি, তার তুলনা হয় না। কারণ? আমি ভারতীয়। আমি কৃষ্ণ মেনন ও নেহরুর দেশের মানুষ। ম্যাকারিয়স বারবার আমাকে বললেন, নেহরুর সদিচ্ছা আর রাষ্ট্রপুঞ্জে কৃষ্ণমেননের অবিস্মরণীয় বক্তৃতার জন্যই সাইপ্রাস আজ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আমাদের দেশের দীনতম দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষও জানে নেহরু আর কৃষ্ণ মেননের জন্যই সাইপ্রাস দু টুকরো হয়নি। তাইতো এই দুজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতার ছবি আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষের ঘরে পাওয়া যাবে।
বেলগ্রেডে গিয়ে ম্যাকারিয়স নেহরুকে আমার কথা বলেছিলেন। কী দারুণ খুশি হয়েছিলেন নেহরু। আর কৃষ্ণ মেননকে আমিই বলেছিলাম ম্যাকারিয়সের কথা। উনি স্বভাবসিদ্ধভাবে একটু হেসে আমার কানে ফিস ফিস করে বলেছিলেন, বাট আই কুড নট ডু এনিথিং টু স্টপ দ্য পাটিশান অব মাই ওন কান্ট্রি!
