এক কালা দতের কালি
যাদ্যা কলম লিখি,
আরো কাল চক্ষের মণি
যাদ্যা দৈনা দেখি—
এ গুলি ভাল, আরও সংগ্রহ কর। এক সময় আমি এর কতকগুলি সংগ্রহ করিয়েছিলাম।
এই বলিয়া তিনি তার বইপত্র খুলিয়া একখানা নোট বই বাহির করিলেন। আমি দেখিয়া আশ্চর্য হইলাম, কত আগে অবনবাবু তার কোন ছাত্রের সাহায্যে যশোর ও নদীয়া জেলা হইতে অনেকগুলি মুর্শিদা-গান সংগ্রহ করাইয়াছেন।
দীনেশদা অবনবাবুকে, বলিলেন, ‘জসীমের মুর্শিদা-গানের সংগ্রহ আমার কাগজে ছাপিয়েছি। অনেকে বলে, এগুলো ছাপিয়ে কি হবে?’
অবনবাবু বলিলেন, ‘মশাই, ও সব লোকের কথা শুনবেন না। যত পারেন, এগুলো ছেপে যান। এর পরে এগুলো আর পাওয়া যাবেনা।’
তারপর নানা রকমের গ্রাম-গানের বিষয়ে আলাপ হইল। কবিগান যাত্রাগান জারীগান কোথায় কি ভাবে গাওয়া হয়, কাহারা গায়, কোথায় কোন গাজীর গানের দল ভাল রূপকথা বলে, শিশুর আগ্রহ লইয়া তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। উত্তর দিতে আমার এমনই ভাল লাগিল!
কিশোর বয়স্ক একটি ছেলে আমার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। এক বৎসর আগে এর সঙ্গে আমার আলাপ হইয়াছিল। দীনেশা প্রেসিডেন্সী কলেজে রবীন্দ্রনাথের “মুক্তধারা” বইখানার অভিনয় পরিচালনা করিয়াছিলেন। সেই উপলক্ষে আমি প্রেসিডেন্সী কলেজে গিয়া অভিনয় দেখি। আমার পাশে একটি ছোট্ট থোকা আসিয়া বসিল। অপরের সঙ্গে আলাপ করিবার তাহার কী আগ্রহ। সে-ই আমার সঙ্গে প্রথম কথা বলিল। আমি কোথা হইতে আসিয়াছি, কি করি ইত্যাদি। হয়ত সেই আলাপে নিজের পরিচয়ও দিয়াছিল। তার কথা একদম ভুলিয়া গিয়াছিলাম। খোকা আসিয়া আমার সঙ্গে আলাপ করিয়া সেই পরিচয়ের সূত্রটি ধরাইয়া দিল। অবনবাবুর নিকট হইতে বিদায় লইয়া কল্লোল-অফিসে ফিরিয়া আসিলাম।
অবনবাবুর বাড়িতে যে গল্পটি বলিব ঠিক করিয়াছিলাম, সারাদিন মনে মনে তাহা আওড়াইতে লাগিলাম। এই গল্প আমি কতবার কত জায়গায় বলিয়াছি। সুতরাং গল্পের কোন কোন জায়গা শুনিয়া ঠাকুরবাড়ির শ্রোতারা একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া যাইবেন, তাহা ভাবিয়া মনে মনে রোমাঞ্চিত হইতে লাগিলাম।
বিকালবেলা দীনেশার জরুরী কাজ ছিল। আমাকে সঙ্গে লইয়া অবনবাবুর বাড়ি চলিলেন পবিত্বদা। সুপ্রসিদ্ধ সাহিত্যিক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়। অবনবাবুর বাড়ি আসিয়া দেখি—সে কী বিরাট কাণ্ড! রবীন্দ্রনাথের বিচিত্রা-ঘরের হলে গল্পের আসর বসান হইয়াছে। বাড়ির যত ছেলেমেয়ে, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতী সকলে আসিয়া সমবেত হইয়াছে গল্প শুনিতে। অবনবাবুর দুই ভাই গগনেন্দ্রনাথ আর সমরেন্দ্রনাথ আগেই আসিয়া আসন গ্রহণ করিয়াছেন। আরও আসিয়াছেন রবীন্দ্রনাথের সকল সুরের কাণ্ডারী আর সকল গানের ভাণ্ডারী দিনেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ। গল্পের আসরের উপলক্ষ করিয়া হলটিকে একটু সাজান হইয়াছে। কথক ঠাকুরদের মত সুন্দর একটি আসনও রচিত হইয়াছে আমার জন্য।
এসব দেখিয়া আমার চোখ ত চড়কগাছ! সুদূর গ্রামদেশের লোক আমি। জীবনে দুই-এক বারের বেশী কলিকাতা আসি নাই। শহরে হাঁটিতে চলিতে কথা কহিতে জড়ায় জড়াইয়া যাই। আজ এই আসরে আমি গল্প বলিব কেমন করিয়া? আমার বুকের ভিতরে ঢিপঢিপ করিতে লাগিল। আমার ভয়ের কথা পবিত্বদাকে বলিলাম। তিনি বলিলেন, “তুই কোন চিন্তা করিসনে। যা জানিস বলে যাবি। এঁরা খুব ভাল শ্রোতা।”
পবিত্রদা সাহস দিলেন। কিন্তু আমার ভয় আরও বাড়িয়া গেল। সভা-স্থলে অবনবাবু আসিলেন। তিনি সহাস্যে বলিলেন, “দেখ, তোমার গল্প শোনার জন্য কত লোক এনে জড় করেছি। রবিকাকেও ধরে আনতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তিনি একটি কাজে অন্যত্র চলে গেলেন। এরারে তবে তুমি আরম্ভ কর।”
বলির পাঠার মত আমি সেই আসনে গিয়া বসিলাম। পবিত্রদা আমার পাশে। কিন্তু থাকিলে কি হইবে? সামনের দিকে চাহিয়া দেখি—রঙিন শাড়ীর ঝকমকি, সুগন্ধি গুড় আর সেন্টের গন্ধ। আমার বুকের দুরুদুরু আরও বাড়িয়া গেল।
অবনবাবু তাড়া দিলেন, “এবার তবে আরম্ভ হোক রূপকথা।”
আমার তখনও কলিকাতার বুলি অভ্যস্ত হয় নাই। কিছুটা কলিকাতার কথ্য ভাষায়, আর কিছুটা আমার ফরিদপুরের ভাষায় গল্প বলিতে আরম্ভ করিলাম।
উত্তরে বন্দনা করলাম হিমালয় পর্বত,
যাহার হাওয়ায় কাপে সকল গাছের পাত।
পুবেতে বন্দনা করলাম পুবে ভানুশ্বর,
একদিকে উদয় গো ভানু চৌদিকে পশর।
পশ্চিমে বন্দনা করলাম মক্কা-মদিস্থান,
উদ্দেশ্যে জানায় গো সালাম মমিন মুসলমান।
দক্ষিণে বন্দনা করলাম ক্ষীরনদীর সাগর,
যেখানে বাণিজ্য করে চান্দ সওদাগর।
চার কোণা বন্দনা কইরা মধ্যে করলাম স্থিতি,
এখানে গাব আমি ওতলা সুন্দরীর গীতি।
গল্প বলিতে বলিতে গল্পের খেই হারাইয়া ফেলি। পরের কথা। আগে বলিয়া আবার সেই ছাড়িয়া-আসা কথার অবতারণা করি। দশ-পনের মিনিট পরে দিমুবাবু উঠিয়া গেলেন। সামনে শাড়ীর ঝকমকিতে দোলায়া কৌতুকমতীরা একে অপরের কানে কানে কথা বলিতে লাগিলেন। কেউ কেউ উঠিয়া গেলেন। সেই সঙ্গে সঙ্গে আমার ভিতরেও পরিবর্তন হইতে লাগিল। কোন রকমে ঘামে নাহিয়া বুকের সমস্ত টিপটিপানি উপেক্ষা করিয়া গল্প শেষ করিলাম।
অবনবাবু বলিলেন, “বেশ হয়েছে।” কিন্তু কথাটা যে আমাকে শুধু সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলিলেন, তাহা আর বুঝিতে বাকী রহিল না।
দেশে ফিরিয়া মোহনলালের কাছে পত্র লিখিলাম। আবার আমি তোমাদের বড়ি গিয়া গল্প বলিব। যতদিন খুব ভাল গল্প বলা না শিখিতে পারি, ততদিন কলিকাতা আসিব না।
