২.
বিবাহিত জীবনের পরিণাম সম্বন্ধে পাঞ্জাবি ভাষায় একটি প্রবাদ আছে –
ভুল গেয়া রাগরঙ্গ, ভুল গেয়া ইয়কড়ি,
ইয়াদ রহা আজ খালি তেল নুন লকড়ি।
ইংলন্ডের সঙ্গে ভারতবর্ষের সম্বন্ধ আজকাল কতকটা ঐ ভাবের দাঁড়িয়েছে। আমরা শিক্ষিত ভারতবাসীরা এতদিন প্রভুর চিত্ত আকর্ষণ করবার জন্য কতই-না হাবভাব লীলাখেলার চর্চা করেছি। ওনার মনোমত কেশবিন্যাস বেশবিন্যাস বাগবিন্যাসের চাতুরী অভ্যাস করেছি। আত্মহারা হয়ে ইউরোপের আত্মীয় হতে যত্ন ও পরিশ্রমের এটি করি নি। এত করেও যখন মন পেলাম না, তখন মান-অভিমানের পালা শুরু করলুম। ফল তাতে উলটো হল–দাম্পত্য প্রণয়ের দাবি করাতে দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হয়েছে। তাই আজ তেল নুন লকড়ির কথাই আমাদের মনে প্রাধান্য লাভ করেছে। মানবজাতিকে আমরা যে যেই ভাবে দেখি-না কেন, মানবজীবনে সকলেই তেল নন লকড়ির গুরত্ব স্বীকার করতে বাধ্য। দেহকে আত্মার কারাগারই মনে করি, আর আত্মার মন্দিরই মনে করি, এ পৃথিবীতে দেহমনের অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধের ভিত্তির উপর ব্যক্তিগত ও জাতিগত জীবন গড়তে হবে। ইহলোকেব সত্যকে মিথ্যা জ্ঞান করলে শুধু পরলোকপ্রাপ্তির সম্ভাবনা বেড়ে যায়। হিন্দুশাঘের মতে অন্ন প্রাণ। সুতরাং অন্নচিন্তাই প্রাণীমাত্রেরই আদিম চিতা। এই অন্নচিন্তা হতে উদ্ধার না পেলে অন্য চিতা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তেল নন লকড়ির অধীনতাপাশ মোচন না করতে পারলে মনের এবং আত্মার পুরো স্বাধীনতা পাওয়া যায় না। মেটিরিয়াল প্রসপারিটি সভ্যতার চরম লক্ষ্য নয়, কিন্তু একটি বিশিষ্ট উপায়। তেল নুন লকড়ির অধীনতা হতে মুক্ত হবার একমাত্র উপায় –তেল নন লকড়ির সংস্থান করা। আমাদের আজ হঠাৎ চৈতন্য হয়েছে যে, ভারতবাসীর সে সংস্থান নেই। আমরা শুকিয়ে যাচ্ছি, কেননা দেশের রস বিদেশে টেনে নিচ্ছে। নিজ দেশের রস নিজ দেহের রক্তে কিরূপে পরিণত করতে পারি, সেই আমাদের প্রধান সমস্যা। আমরা যদি ভুলে গিয়ে না থাকি, তা হলে আমাদের ‘রাগরঙ্গ ইয়কড়ি’ ভুলে যেতে হবে, আর আমাদের মনে যদি না থাকে, তা হলে মনে রাখতে হবে শুধু ‘তেল নন লকড়ি’। রাকিন সমস্ত জীবন ধরে ইংলণ্ডকে এই বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে, ইকনমিকস-এই গ্রীক শব্দের আদিম অর্থ হাউসহোন্ড ম্যানেজমেন্ট, অর্থাৎ গেরস্থালি। প্রতি গহে যদি লক্ষ্মী না থাকেন, তা হলে সমগ্রজাতি লক্ষ্মীছাড়া হবে। ঘর যদি অগোছাল রাখ, তা হলে হাটে-বাজারে যতই কেনা-বেচা কর-না কেন, তাতে নিজে কিংবা জাতি যথার্থ স্ত্রী এবং সখ লাভে সমর্থ হবে না। এ মতের মধ্যে এইটকু খাঁটি সত্য নিহিত আছে যে, দশে মিলে জাতীয় সমন্ধিলাভের যে সমবেত চেষ্টা করি, তার সফল আমরা ঘরে ঘরে স্বেচ্ছাচারিতায় নিষ্ফল করে দিতে পারি। আমরা যদি সকলে একত্র হয়ে বাইরে এক দিকে টানি, আর প্রতি লোক ঘরে এসে তার উলটো টান টানি-তা হলে ঘর বার দুই নষ্ট হবে। আমি গ্রাফিনের শিষ্যস্বরূপে এই কথা প্রচার করতে উদ্যত হয়েছি যে, সুগৃহিণীর প্রথম এবং প্রধান কাজ গহের সম্মার্জনা করা।
৩.
আমরা যে গহে বাস করি, সে যে কোন দেশীয় বলা কঠিন। বাংলার বাইরে, কি স্বদেশে কি বিদেশে, কোথাও তার জুড়ি দেখতে পাই নে। গৃহ যেমন সমাজের মূল, তেমনি আবার শহরেরও বুনিয়াদ। গৃহ হতে পল্লি, পল্লি হতে নগর, নগর হতে শহর-ক্রমবিকাশের এই নিয়ম। রোম প্যারিস প্রভৃতি বনেদি শহরের আকি, টেকচরেতেই তার ইতিহাস লিপিবদ্ধ। ঐ আর্কিটেকচরের প্রসাদেই নাগরিকগুণ বর্তমানে অতীতের সঙ্গে ঘর করে, অতীতের সুখ দুঃখ আশা ভরসা সফলতা ও বিফলতা, গৌরব ও লজ্জা অলক্ষিতে তাদের মন অধিকার করে নেয়; প্রত্যেকেই নিজের আত্মার ভিতর বহত্তর জাতীয় আত্মার অস্তিত্ব অনুভব করে। তাদের পক্ষে স্বজাতীয়তার ও ঘদেশীয়তার কাছে নিজেদের ধরা দেওয়া নিতান্ত স্বাভাবিক; তা হতে মুক্তি পাওয়াই আয়াসসাধ্য। আমাদের ভিতর মহদতঃকরণ বাকিরা যেমন অহংজ্ঞান খর্ব করে স্বজাতির পায়ে আত্মসমর্পণ করাটা জীবনের চরম লক্ষ্য বলে মনে করেন, তেমনি ইউরোপের মহদন্তঃকরণ ব্যক্তিরাও স্বজাতিজ্ঞান খর্ব করে মানবজাতির পায়ে আত্মসমর্পণ করাটা জীবনের চরম লক্ষ্য বলে মনে করেন। আমাদের সাধনার বিষয় হচ্ছে ন্যাশনালিজম, তাদের উচ্চ সাধনার বিষয় হচ্ছে ইনটারন্যাশনালিজম। সে যাই হোক, কলিকাতার মতো ভুইফোঁড় শহরে শ্রীহীন অর্থহীন কিভূতকিমাকার ভুইফোঁড় গহে বাস করে আমাদের পক্ষে স্বদেশী ভাব রক্ষা করাটা সহজ নয়। চকমেলানো বাড়ি হালফ্যাশানে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়েছে। একটি সবা গোছের ঘর, তার এপাশে দুটি, ওপাশে দুটি–এই পাঁচ কামরা নিয়ে আমাদের গহ। মধ্যের ঘরটি হচ্ছে বাইরের ঘর, এবং উভয় পাবের বহির্দিকের ঘর-কটি হচ্ছে অন্দর। বাসস্থানের এই উলটোপালটা ভাবের সঙ্গে আমাদের সামাজিক জীবনের বরাবর যোগ রয়ে গেছে। আমাদের গ্রীষ্মের দেশে ঘরে হাওয়াও চাই ছায়াও চাই, একসঙ্গে দুই পাওয়া অসম্ভব বলে এ দেশের গৃহ দু ভাগে বিভক্ত হওয়া দরকার। এক অংশ বায়ুর পক্ষে যথেষ্ট ভোলা, অপর অংশ সূর্যের পক্ষে যথেষ্ট রন্ধ। পৃথিবীর সর্বত্রই পঞ্চভূত মিলে মানুষের গৃহনির্মাণের হিসাব বাতলে দেয়। প্রকৃতিই এ দেশের গৃহ সদর এবং অন্দরে ভাগ করতে শিখিয়েছিলেন। এবং আমাদের সমাজের গঠনও গহের গঠনের অনেকটা অনুসরণ করেছে। এই কারণে গ্রীষ্মপ্রধান দেশেই অবরোধ একটি সামাজিক প্রথা। আমার বিশ্বাস, এই কড়া রোদ এবং চড়া আলোর দেশে অসম্পশ্যা হবার লোভেই রমণীজাতি স্বেচ্ছায় অন্তঃপুরবাসিনী হয়েছেন। যেখানে গহে শ্রীপুরুষের স্বতন্ত্র রাজ্যের সীমা নির্দিষ্ট নেই, সেখানে সমাজেও শ্রীপুরুষের সাম্য অর্থে ঐক্য—এই ভুল বিশ্বাস জন্মলাভ করে। ইংরেজিয়ানার প্রসাদে আমাদের বাসগৃহের সদর অন্দর ভেস্তে যাবার প্রধান ফল এই যে, আমাদের স্ত্রীপুরুষ উভয়েই গহে অনেকটা সংকুচিত ভাবে বাস করে। আমাদের ড্রয়িংরুম পাড়াপড়শীর বৈঠকখানা হতে পারে, এবং বাড়ির কোনো অংশই মেয়েদের দুর্গে নয়। এ দেশটি যে বিদেশ, সেটা সর্বদা মনে জাগরুক রাখবার জন্য ইংরেজ দেশীয় সমাজ হতে আলগোছ হয়ে থাকেন, নইলে ভয় পাছে জাতিরক্ষা না হয়। আমরা তাঁদের অনুকরণে বাসা বাঁধলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্ব-সমাজ হতে দূর হয়ে পড়ি। মোটামুটি আমার বক্তব্য কথা এই, মানুষমাত্রেরই দেশের সঙ্গে প্রধান যোগ গৃহ দিয়ে; স্বদেশীয়তার গোঁড়াপত্তন ঐখানেই, গৃহ্যসূত্র হতেই মানবধর্মশাস্ত্রের উৎপত্তি। গহের রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে গহীর রুপান্তরও অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এ-সব সত্ত্বেও আমি কাউকে বাড়িবদলানোর পরামর্শ দিয়ে লোকসমাজে নিজেকে বিষয়বুদ্ধিহীন বলে প্রমাণ করতে রাজি নই। এ বিষয়ে আমার ভবিষ্যতের আশার একমাত্র ভরসা-একটা বড়োগোছের ভূমিকম্প।
