আলোকিত মানুষরা নিরস্ত্র। কারণ তারা অস্ত্রে আর খুনোখুনিতে বিশ্বাসী নয়। অন্ধকারের লোকদের হাতে চাপাতি, হাতে রক্ত, মগজে মূর্খ। যারা দূরে দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চপ, তাদের এখন যে কোনও একটি পথ বেছে নিতে হবে, নিজেকে তারা জিজ্ঞেস করুক, তারা অন্ধকারের পথে যেতে চায় নাকি আলোর পথে। অন্ধকারের পথ মিথ আর মিথ্যের পথ, খুন খারাবির পথ, বৈষম্য, নারী বিদ্বেষ, ঘৃণা আর সংকীর্ণতার পথ। পাথর ছুঁড়ে মানুষ হত্যা আর কথায় কথায় মুণ্ডু কেটে ফেলার জগতে শ্বাসরুদ্ধকর অনিশ্চয়তা নিয়ে বেঁচে থাকতে যারা চায়, তারা অন্ধকারের হাত ধরে হেঁটে যাক, হেঁটে যাক রূপকথার স্বর্গর্বাসের লোভে। আর যারা ও পথে চায় না যেতে, যারা মানবাধিকার, মনুষ্যত্ব, সমতা আর শান্তিতে বিশ্বাস করে, তারা রুখে দাঁড়াক। আজ যদি তারা রুখে না দাঁড়ায়, তবে আর কবে? রাজপথ ভাসছে তাজা তরুণের রক্তে।
দেশে মৌলবাদ বাড়ছে, মানুষ সতর্ক হও, রুখে দাঁড়াও– বলেছিলাম পঁচিশ বছর আগে। তখন আমাকে দোষ দিয়েছিল সমাজের তাবড় তাবড় বুদ্ধিজীবীরা। বলেছিল, কোনও মৌলবাদীর অস্তিত্বই নেই দেশে, আর যদি থাকেই তবে আমার কারণে নাকি মৌলবাদীর উৎপত্তি হয়েছে, আমিই যত নষ্টের মূল। আমাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। গত কুড়ি বছর তো আমার চিহ্নমাত্র কেউ দেখতে পায়নি, আমার লেখাপত্রও কেউ ছাপায়নি, তাহলে মৌলবাদীরা এত ভয়ংকর একটি চেহারা কী করে পেলো! কে তাদের ননীটা ছানাটা খাইয়ে ফ্রাংকেন্সটাইন বানিয়েছে? কেন আজ দেশ ছেয়ে গেছে ধর্মান্ধতায়, মৌলবাদে আর সন্ত্রাসে? দেখেও দেখবো না, শুনেও শুনবো না করলে এই হয়। সুবিধেবাদী বুদ্ধিজীবী আর দূরদৃষ্টিহীন মুখ রাজনীতিকদের দেশে মৌলবাদ বাড়বে না তো মানববাদ বাড়বে?
যে বীজ রোপণ করা হয়েছে, তার ফসল আজ ভোগ করছে বাংলাদেশ। ধর্মীয় অনুভূতিকে উসকে দেওয়ার জন্য অগুনতি মসজিদ মাদ্রাসা বানানো হয়েছে। আখেরে এগুলো ক্ষতিকর জেনেও বানানো হয়েছে। মাদ্রাসা থেকে পাশ করে আজ অবধি কেউ বিজ্ঞানী বা দার্শনিক বা মহামানব কিছু হয়নি। কিন্তু দেশটার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় যে ই এ যাবৎ এসেছে, দুদিনের গদির লোভে দেশটার ধ্বংস ডেকে এনেছে, জেনে বুঝে মৌলবাদীদের মাথায় তুলে নেচেছে, ওদের সঙ্গে আপোসের ষড়যন্ত্র করেছে। ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছে মসজিদ মাদ্রাসাকে মৌলবাদী তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করার। রাজনৈতিক ইসলামের নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে মসজিদ মাদ্রাসা থেকেই, আর দুরদৃষ্টিহীন সরকার জেনে বুঝেই সায় দিচ্ছে এসবে। কোনও এক নারীবিরোধী বিজ্ঞানবিদ্বেষী আল্লামা শফিকে শুনেছি হাসিনা সরকার কত হাজার একর জমি দান করেছেন। ওই জমিতে তিনি যেন একটা বিশাল কারখানা বানিয়ে ফেলতে পারেন, যে কারখানায় ছেলেপিলেদের মাথা-মগজের সর্বনাশ হবে, এবং ভয়ংকর সব সন্ত্রাসী তৈরিও হবে। শুধু অর্ডার দিলেই হয়, মাদ্রাসার ছাত্ররা তাদের হুজুরের অর্ডার মাথা পেতে মেনে নেবে। বোবা-কালা-বধিরদের বোধশক্তি নেই কাজটা অন্যায় কি না, কাজটা করা উচিত হচ্ছে কিনা, কাজটা করলে ফলটা কী হবে তা চিন্তা করার। হুজুররা তাদের দেখিয়েছে এক রূপকথার ফুলের লোভ। খুন করলে। তারা বেহেশত পাবে। বেহেশতের লোভে আজ এরা বর্বর খুনী হতে দ্বিধা করছে না। এ জীবনে আমোদ প্রমোদের সুযোগ হলো না, পরকালে যথেচ্ছ ভোগের ব্যবস্থা পাকা করার জন্যই এই খুন। সরকার জঙ্গী তৈরিতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করছে ইহকালের গদিরক্ষার জন্য, জঙ্গীরা ইসলাম-সমালোচকদের খুন করছে পরকালের গদি রক্ষার জন্য। সরকার আর জঙ্গীর চরিত্রে খুব একটা ফারাক নেই।
ফারাবিকে ধরা হয়েছে অভিজিৎকে হত্যার জন্য। আসল খুনীদের টিকিটি চাইলেও ছুঁতে পারবে না পুলিশ, এ আমি বিশ্বাস করি না। ছুঁতে চাইলে কি ছুঁতে পারতো না? আরিফুর আর জিকিরুল্লাহকে ধরা হয়েছে ওয়াশিকুর বাবুকে হত্যা করার কারণে। কিন্তু এখনও ধরা হচ্ছে না ওদের হুজুরটিকে, যে হুজুর তাদের বলেছে ওয়াশিকুরকে খুন করলে ওদের বেহেশত মিলবে। ছোট-হুঁজুরের বাপ বড়-হুঁজুরকে ধরা হচ্ছে না, ধরা হচ্ছে না মাদ্রাসার প্রধান নাটের গুরু শফিকে, যে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে ব্লগারদের মেরে ফেলা মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব।
সন্ত্রাসীরা আমার মুণ্ডুটা এর মধ্যে কেটে না ফেললে হয়তো দেখে যেতে পারবো বাংলাদেশে শরিয়া আইন চালু হয়েছে, সৌদি আরবে যেমন রাস্তার ওপর মানুষকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে তলোয়ার দিয়ে মুণ্ডুটা ঝপাং করে কেটে ফেলা দেওয়া হয়, বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে। ধর্ষিতা মেয়েরা সাক্ষীর অভাবে ব্যাভিচারি বলে সাব্যস্ত হচ্ছে, দুররার মার খাচ্ছে। কোনও মেয়েই বোরখা ছাড়া বাইরে বেরোতে পারছে না, গাড়ি ঘোড়া সাইকেল রিক্সা কিছুই চালাতে পারছে না, অভিভাবক ছাড়া দেশের বাইরে যেতে পারছে না। আত্মীয় নয় এমন কোনও পুরুষের সঙ্গে জরুরি কোনও কথাও বলতে পারছে না। অধিকার বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই মেয়েদের।
অনেকে রাগ করে বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তান বা পাকিস্তান বলে। আমি বাংলাদেশকে পাকিস্তানের চেয়েও ভয়ংকর দেশ বলি। বাংলাদেশে মৌলবাদের অবাধ চাষ হয়। ফলনও বেশ ভালো। পাকিস্তানে মৌলবাদ নানাভাবে দমন করা হয়। পাকিস্তানে মৌলবাদী খুনীরা ধরা পড়ে এবং জেলে যায়। বাংলাদেশে মৌলবাদী খুনীদের ইচ্ছে করেই ধরা হয় না। তাদের কোনও শাস্তিও দেওয়া হয় না। পাকিস্তানে বাংলাদেশের মতো মুক্তচিন্তক আর যুক্তিবাদীদের এক এক করে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হচ্ছে না। একসময় বাংলাদশে আর কোনও মুক্তচিন্তক হয়তো থাকবে না। কিন্তু পাকিস্তানে থাকবে। পাকিস্তানের মুক্তচিন্তকরা একসময় তাদের দেশটা যেন বাংলাদেশ হয়ে না যায়, তার চেষ্টা করবে।
