২.
শুনেছি ভোট কারচুপি হয়েছে বাংলাদেশে। কারচুপি হলেই বা কী হলেই বা কী? সেই তো থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়। যেই বসুক গদিতে, দেশটাকে নষ্ট করা ছাড়া কি তাদের আর কোনও কাজ আছে? মানুষও ঠিক জানে সব দলের চরিত্র এক। মানুষ আসলে ভোট দেয় তাকে যার চরিত্র কিছু কম নষ্ট, যে কিছুটা কম সন্ত্রাসী। আর যারা এর মধ্যে সন্ত্রাসে বেশ হাত পাকিয়েছে, তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই সন্ত্রাসে বেশি মদত দেওয়া দলটিকে জেতাতে চায়।
ভোট টোটের নিয়ম বন্ধ করে দিলেই হয়। অ্যানার্কি সৃষ্টি হবে? অ্যানাকি কি চলছে না?একটা সময় দেশের নড়বড়ে অবস্থা দেখে বলতাম, কামাল পাশার মতো একটা সেকুলার ডিক্টেটর চাই। এখন আর বলি না। গণতন্ত্রের বারোটা বেজেছে বলে তো ডিক্টেটরশিপ চাইতে পারি না। তারচেয়ে গণতন্ত্রের নামে দেশে যা হচ্ছে হোক। দেশটা গোল্লায় যাবে, নয়তো ধর্মতন্ত্র দেশটাকে একদিন গিলে খাবে। ধর্মতন্ত্রই দেশকে নিয়ে যাবে একনায়কতন্ত্রের দিকে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ রুখে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে আছে যুগের পর যুগ। এভাবেই বাস করে অভ্যেস হয়ে গেছে। তারা রুখে তো দাঁড়ায়ই না, দেয়ালে পিঠ না থাকলেই বরং বিস্মিত হয়।
৩.
অসুখ হলে মা বাবার জন্য বড় ব্যাকুল হই। আজ সারাদিন জ্বর, গাব্যথা, বমি। সারাদিন চেয়েছি একটি হাত কপাল স্পর্শ করুক। জ্বর দেখুক। জ্বরের ঘোরে বারবার এপাশ ওপাশ করেছি। জ্বর হলে মা কপালে জলপট্টি লাগিয়ে দিত। খাটের কিনারে মাথাটা রেখে, পিঠ আর মাথার তলায় একটা অয়েলক্লথ বিছিয়ে অনেকক্ষণ মাথায় জল ঢালত। জল গুলো বালতিতে পড়ত, সেই বালতির জল আবার মাথায় ঢালত, এইভাবে কতক্ষণ যে মা জল ঢালত! মার কোনো ক্লান্তি ছিল না! জ্বর হলে পাশে বসে গায়ে হাত বুলিয়ে দিত বাবা আর ওষুধ গেলাত। জ্বর হলে আমি উদ্বিগ্ন হইনি কখনো, হয়েছে আমার মা বাবা। আমার অসুখ দ্রুত সারিয়ে তুলত আমার মা বাবা। এখন মা নেই, বাবাও নেই। এখন একা একাই অসুখে ভুগি। কেউ নেই কপাল স্পর্শ করে জ্বর দেখার, গায়ে হাত বুলোবার, কেউ নেই কপালে জলপট্টি দেওয়ার, কেউ নেই মাথায় জল ঢালার। ছোটবেলাটা বড় ফিরে পেতে ইচ্ছে করে।
ডেঙ্গি
তিন বছর আগে ডেঙ্গি হয়েছিল আমার। যে বাড়িতে ছিলাম, সে বাড়ির ছজন মানুষের সেবার ডেঙ্গি হয়েছিল। ডেঙ্গি নিয়ে যারা গবেষণা করছে তাদের টিকিটি দেখিনি ও বাড়িতে। গবেষণা করছিস, একটা বাড়িতে ছজনের কেন ডেঙ্গি হলো তা বুঝতে ও বাড়িতে আসবি না? আমি টুইটারে জানিয়েছিলাম ঘটনা। কারও কোনও হেলদোল দেখিনি।
ডেঙ্গি কিন্তু একা আসে না, সঙ্গে আরও রোগশোক নিয়ে আসে। আমার কাছে এসেছিল টাইফয়েডকে সঙ্গী করে। সেবার অরগান নষ্ট করতো ডেঙ্গি ভাইরাস। ডেঙ্গি এক একবার এক এক ক্ষমতা নিয়ে আসে। আমার প্যানক্রিয়াস আর লিভার নষ্ট করেছে। প্যানক্রিয়াস নষ্ট করেছে বলে ডায়বেটিস হয়েছে। ডায়বেটিসের মতো জঘন্য রোগ খুব কমই আছে।
দ্বিতীয়বার ডেঙ্গি হলে সর্বনাশ। আমার মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড আর ফুসফুস অকেজো করবে। নির্ঘাত মারা পড়ব। হাজার হাজার জিহাদি আমাকে মারতে পারলো না। আর ছোট্ট এক ফোঁটা মশা কিনা আমাকে মেরে ফেলছে! স্টিভ আরউইনের মতো। শত শত বিষাক্ত রেপটাইল তাকে মারতে পারলো না, মারলো একটা মাছ, স্টিংরে নাম।
তাইপেই
ইউরোপ-আমেরিকার কবিতা উৎসব, সাহিত্য অনুষ্ঠান, নারীবাদ-মানববাদ মানবাধিকার- ইত্যাদি অনুষ্ঠানে আজ ২২ বছর যাবৎ পারটিসেপিট করছি। কিন্তু অন্য কোথাও যদি যাই, অন্য রকম দেশে? একবার আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো তাইপেই কবিতা উৎসবে। তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেই। কবিতা উৎসবের বিশাল মঞ্চে কবিতা পড়লাম। ওখানেই শেষ নয়, পরদিন এবং তার পরদিন আমাকে আরও আরও জায়গায় আরও আরও বিষয় নিয়ে বলতে হয়েছে। তাইপেই বিশ্ববিদ্যালয়। থেকেও আমন্ত্রণ, ওখানে কবিতা পড়তে হবে, সাহিত্য নিয়ে বলতে হবে, নানারকম জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে হবে। তাইওয়ানিজ সঞ্চালক ছিলেন, একজন দোভাষী ছিলেন। ওখানেও, আমি অবাক হই, একজন শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই হবেন, আমাকে নিয়ে তাঁর বইয়ে লিখেছেন, কবিতাও লিখেছিলেন আমাকে নিয়ে,বই আর কবিতা দুটোই সেদিন দিলেন হাতে।
উৎসবের আয়োজকরা অসাধারণ লোক। একজন তো নিজেই ফিল্ম মেকার। ওঁরাই আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন হাউ সিয়াও সিয়েনএর ছবি দেখার জন্য। দোকানে নিয়ে কিনেও দিয়েছিলেন এক সেট ডিভিড়ি। হাউএর ছবি দেখার পর থেকে হাউ আমার প্রিয় পরিচালকদের তালিকায় পাঁচজনের একজন হয়ে উঠেছেন। তাইপেই ছেড়ে আসার আগের রাতে অ্যাং লীর নতুন ছবি রিলিজ হয়েছিল, সেটা দেখলাম। লাস্ট, কশন। অ্যাং লী তো আমার প্রিয় পরিচালকদের মধ্য অন্যতম একজন। তাঁর ব্রোকবেক মাউন্টেন যে কতবার দেখেছি। যতবারই দেখি, চোখ জলে ভরে ওঠে। অ্যাং লীর নিজের শহর তাইপেইয়ে বসে তাইপেইয়ের সিনেমায় অ্যাং লীর ছবি দেখার আনন্দই আলাদা। লাস্ট কশন ছবিটাও অসাধারণ। গভীর রাতে হোটেলে ফিরেছি। সারারাত কি ঘুম হয়েছিল! কী জানি!
ছবিটা আমার বডিগার্ডকেও দেখিয়েছি। ওর নামটা এখন মনে নেই। ভীষণ সিরিয়াস মুখ। সবসময় একটা ব্যাগ রাখতো হাতে, ওই ব্যাগেই হয়তো রিভলভার টিভলভার ছিল। তাকে প্রথমদিন সঙ্গে বসে লাঞ্চ খেতে বললাম, কিছুতেই রাজি হলো না। রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে রইলো, বললো, আমার ডিউটি তোমাকে প্রটেক্ট করা, তোমার সঙ্গে লাঞ্চ খাওয়া নয়। প্রথম দিকে ভয়ে নীল হয়ে ছিলো মেয়ে, আমি বলেছি রিলাক্স, এখানে কেউ আমাকে মারবে না, তোমার টেনশনের কিছু নেই। ধীরে ধীরে বোধহয় বুঝেছে যে তাইপেইয়ে আমাকে মারার লোক কেউ নেই। একবার তো সমুদ্রের ধারেও নিয়ে গেলো আমাকে, প্যাগোড়া দেখলাম, মিউজিয়াম টিউজিয়ামেও গিয়েছি। তবে যাবার দিন ও একতোড়ো ফুল নিয়ে এলো আমার জন্য। নিজের নাম ঠিকানার কার্ড দিলো। আর এয়ারপোর্টে যখন আমাকে বিয়ে দিচ্ছে, আশ্চর্য, ওর চোখে জল। তাইপেইয়ের সব স্মৃতি ফিকে হয়ে আসছে, কিন্তু ওই মেয়েটির চোখের জল এখনও হীরের মতো দ্যুতি ছড়ায়। ভুলতে পারি না।
দুর্বৃত্ত
খবরে দেখছি দুর্বৃত্তরা নাকি প্রকাশকদের কুপিয়ে খুন করেছে। মুসলমানদের দুর্বৃত্ত কেন বলছে, বুঝি না। খুনীগুলোর তো একটা পরিচয় আছে, নাকি? খুনীগুলো ধার্মিক, কোরান হাদিস মেনে চলে। ওদের দুর্বৃত্ত বলাটা কি ঠিক হচ্ছে? দুর্বৃত্ত হলে সরকার ঠিক ঠিক ওদের শাস্তির ব্যবস্থা করতো। কিন্তু ধর্মপ্রাণ বলেই করছে না। সরকার নিজেও ধর্মপ্রাণ, দেশের অধিকাংশ মানুষই ধর্মপ্রাণ। ধর্মপ্রাণদের সাতখুন মাফ, এ কথা তো আমরা জানিই।
দেশ ১
কলকাতার দেশ পত্রিকা একসময় ছিল সাহিত্যের পত্রিকা। এখন হয়ে গেছে গুজব, স্ক্যান্ডাল, কাকাতু, নাক সিঁটকানো, খোঁচা মারা, দলবাজি, পুরুষবাজি, মাস্তানি, শয়তানি, মিথ্যে আর অপবাদের পত্রিকা। আর এগুলোর জন্য বেছে নেওয়া হয় স্বয়ং আমাকে। কারণ আমার সম্পর্কে কুৎসা রটালে মার খাবার ভয় নেই, মামলায় ফেঁসে যাওয়ার ডর নেই। সাগরময় ঘোষ মারা যাওয়ার পর একসময় অমিতাভ চৌধুরী নামের এক চরিত্রহীন লোককে দেশ এর সম্পাদক করা হয়েছিল। ওই সম্পাদক আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য একবার ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে উন্মাদ হয়ে উঠলেন। কী, না, দেশ পত্রিকা আমার সাক্ষাৎকার ছাপাতে চান, সাক্ষাৎকারটা নেবেন সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে আমার হোটেলে তিনি এক সকালে চলে এলেন। তাজ বেঙ্গলের লাউজে বসে ব্রেকফাস্ট করতে করতে কথা বলছিলাম। সাক্ষাৎকার চলাকালীন অমিতাভ চৌধুরী শ্যামলকে কনুইয়ের গুতো দিয়ে দিয়ে সেক্স নিয়ে প্রশ্ন করার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। সেক্স নিয়ে যে প্রশ্নই তাঁরা করছিলেন, আমি খুব নিস্পৃহ নির্লিপ্ত কণ্ঠে সেসবের উত্তর দিচ্ছিলাম। জীবনে কজনের সঙ্গে সেক্স করেছি– ওঁদের ওসব বিদঘুঁটে প্রশ্ন আমাকে লজ্জা দিচ্ছিল না, আমাকে বরং লজ্জা দিচ্ছিল আমার সামনে বসে থাকা ওই দুই বুড়োর জিভ বেরিয়ে আসা, চোখ বেরিয়ে আসা চেহারা। আমার সঙ্গে আমার ফরাসি প্রেমিক ছিল। ও বুঝতে পারছিল না আমরা কী নিয়ে কথা বলছি।
