কোনো রোগীর রক্ত সুস্থ লোকের রক্তের সহিত মিশিলে, সুস্থ ব্যক্তি রোগী হইয়া দাঁড়ায়। ডাঁশেরা রোগা গোরুর রক্তের বিষ সুস্থ গোরুর রক্তে মিশাইয়া বড়ই অনিষ্ট করে। ইহাতে অনেক সুস্থ গোরুর দেহে রোগ দেখা দেয়। আমাদের যেমন বসন্ত, হাম, প্লেগ প্রভৃতি ছোঁয়াচে ব্যারাম আছে, গোরুদেরও সেই রকম অনেক ব্যারাম আছে। ডাঁশেরাই এই সব ব্যারাম গোরুদের মধ্যে ছড়ায়।
ডাঁশ-মাছিরা কখনই শুক্নো জায়গায় ডিম পাড়ে না। পুকুর বা ডোবার ধারে লতাপাতার গায়ে ইহাদের ডিম দেখা যায়। তার পরে সেই সকল ডিম হইতে শুঁয়ো-পোকার আকারের বাচ্চা বাহির হইলে, সেগুলি পুকুরের ধারের ভিজা মাটি বা কাদায় আশ্রয় লয়। পুকুরের পচা কাদায় ছোট পোকা-মাকড়ের অভাব নাই ডাঁশের বাচ্চারা সেই সকল পোকা-মাকড় খাইয়া বড় হয়। শেষে পুত্তলি-অবস্থায় থাকিবার সময় হইলে উহারা আর কাদায় থাকে না। তখন বুকে হাঁটিয়া পুকুর হইতে একটু দূরে কোনো শুক্নো জায়গায় মাটির তলায় আশ্রয় লয়, এবং সেখানে বেশ নিশ্চিন্ত হইয়া গা ঢাকা দিয়া ঘুমায়। তার পরে ডানা পা ইত্যাদি গজাইলে, ইহারা ভোঁ করিয়া উড়িয়া রক্ত খাইবার চেষ্টায় বাহির হইয়া পড়ে।
৬.৬.২ দ্বিপক্ষ পতঙ্গ : মশা
মশা
এইবার আমরা মশার কথা বলিব। ছোট দেহে লম্বা লম্বা ছয়খানা পা থাকায় ইহাদিগকে কি বিশ্রীই দেখায়! যেমন চেহারায় বিশ্রী, তেমনি কাজেও বিশ্রী। মানুষকে কাম্ড়াইয়া অস্থির করে। ইহাদের মুখে নলের মত লম্বা শুঁড় থাকে। তার পরে গায়ের চাম্ড়া কাটিয়া রক্ত চুষিয়া খাইবার জন্য ছুঁচের মত চারিটা অস্ত্রও লাগানো থাকে। আবার মাথার দুই পাশে হাজার হাজার চোখ। মশার দাঁত নাই। দাঁত দুটাই লম্বা হইয়া ছুঁচের মত হইয়াছে। এই অস্ত্র দিয়া গায়ের চাম্ড়া কাটা হইলে, মশারা মুখ হইতে এক রকম লালা বাহির করিয়া কাটা ঘায়ে লাগাইয়া দেয়। আমাদের শরীরের কোনো জায়গায় ক্ষত হইলে কি হয়, তোমরা তাহা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ,—তথন পাশ হইতে রক্ত আসিয়া বেদনার জায়গায় জড় হয়। কাটা জায়গায় মশার মুখের লালা লাগিলে অবিকল তাহাই হয়। লালার এক রকম মৃদু বিষ থাকে, কাজেই তাহা জ্বালা-যন্ত্রণার সুরু করে এবং পাশ হইতে তাজা রক্ত আসিয়া সেখানে জমা হয়। মশারা এই রকমে শুঁড়ের কাছে রক্ত পাইয়া তাহা চুষিয়া খাইতে থাকে।
একবার পেট ভরিয়া রক্ত খাইলে মশারা দুই তিন দিন আর কিছু খায় না। এই কয়েক দিন তাহারা চুপ করিয়া পড়িয়া থাকে, তার পরে গা ঝাড়া দিয়া আবার রক্তের সন্ধানে বাহির হইয়া পড়ে। রক্ত খাইলে যে কেবল ইহাদের শরীরই পুষ্ট হয়, তাহা নয়; সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের পেটের ভিতরকার ডিমগুলিও পুষ্ট হয়।
স্ত্রী ও পুরুষ মশা
মশাদের স্ত্রী-পুরুষ ভেদ আছে। স্ত্রী ও পুরুষের চেহারাতে অনেক তফাতও দেখা যায়। স্ত্রীদেরই মুখে ঐ রকম শুঁড় ও ছুঁচ লাগানো থাকে। পুরুষ মশারা নিতান্ত নিরীহ প্রাণী। তাহারা রক্ত খায় না এবং বেশি দিন বাঁচেও না। ডানা গজাইলে দুই এক দিনমাত্র এদিক্ ওদিক্ উড়িয়া ফুলফলের রস শুষিয়া খায় এবং তার পরে মরিয়া যায়। সুতরাং দেখা যাইতেছে, রক্ত খাওয়ার জন্য সব মশাকে দোষ দেওয়া যায় না। স্ত্রী-মশারাই দুষ্ট। ইহারাই আমাদের কানের গোড়ায় ভন্ ভন্ শব্দ করিয়া ঘুম ভাঙ্গাইয়া দেয় এবং রক্ত খাইয়া হাত পা ফুলাইয়া দেয়।
স্ত্রী ও পুরুষ সকল মশারই দুখানা করিয়া ডানা থাকে। কিন্তু ইহা পিঁপ্ড়ে বা বোল্তাদের ডানার মত স্বচ্ছ নয়। তা’ছাড়া মাছিদের ডানার গোড়ায় যে দুটি খুঁটির মত অংশ থাকে, মশার ডানার কাছে তাহাও দেখা যায়। উড়িবার সময়ে দেহকে সাম্য অবস্থায় রাখার জন্য ঐ খুঁটি দুটা দরকার হয়।
মশার ডিম ও বাচ্চা
মশার ডিম পাড়া, ডিম হইতে বাচ্চা বাহির হওয়া এবং সেই বাচ্চা হইতে নূতন মশার উৎপত্তি হওয়া—সকলি বড় আশ্চর্য্য-জনক।
যে প্রাণী ডাঙায় বাস করে এবং ডাঙাতেই চরিয়া বেড়ায় তাহারা প্রায়ই ডাঙাতেই ডিম পাড়ে। কিন্তু মশারা তাহা করে না। পচা পুষ্করিণী বা গর্ত্তের বদ্ধ জলই তাহাদের ডিম পাড়িবার জায়গা। কখনো টবের নর্দ্দামার ও পাতকূয়োর বদ্ধ জলেও তাহাদিগকে ডিম পাড়িতে দেখা যায়।
ডিম পাড়ার সময় হইলেই মশারা নিকটের নোংরা এবং বদ্ধ জলের দিকে ছুটিয়া চলে এবং তাহাতে ডিম পাড়ে। সেগুলি জলে ভাসিয়া বেড়ায়, কিন্তু বিচ্ছিন্ন হইয়া ভাসে না। ডিম পাড়া শেষ হইলে মশারা সেগুলিকে পিছনের পা দিয়া একত্র করে এবং তার পরে লালার মত এক রকম জিনিস দেহ হইতে বাহির করিয়া, সেগুলিকে পরস্পর আট্কাইয়া রাখে। এই রকমে ডিমগুলি একত্র থাকিয়া ভেলার মত জলের উপরে ভাসিয়া বেড়ায়।
মশাদের ডিম হইতে বাচ্চা বাহির হইতে বেশি সময় লাগে না। শীঘ্রই প্রত্যেক ডিম হইতে একএকটি বাচ্চা বাহির হইয়া জলের উপরে কিল্বিল করিতে থাকে। এই বাচ্চাদের চেহারা বড়ই অদ্ভুত। মুখে এক এক গোছা চুলের মত লোম লাগানো থাকে। জলের ছোট ছোট পোকা-মাকড়দিগকে ইহারা ঐ চুলের গোছা দিয়া ঠেলিয়া মুখে পূরিয়া দেয়। জলে বাস করিবার সময়ে জলের পোকাই ইহাদের খাদ্য।
মশার বাচ্চা কখনই মাথা উপরে রাখিয়া মাছের মত সাঁতার দেয় না। লেজ উঁচু এবং মাথা নীচু করিয়া সাঁতার দেওয়াই ইহাদের স্বভাব। মাছের মত ইহাদের কান্কো নাই। আমরা যেমন নাকের ছিদ্র দিয়া বাতাস টানিয়া বাঁচিয়া থাকি, মশার বাচ্চারাও সেই রকম লেজে-লাগানো সরু নলের মত ছিদ্র দিয়া বাতাস টানিয়া বাঁচিয়া থাকে। এইজন্যই লেজ উপরে রাখিয়া ইহারা সাঁতার দেয় এবং যখন দরকার হয় তখন লেজের ছিদ্রটা জলের উপরে উঠাইয়া বাতাস টানিয়া লয়। মুখে যেমন চুলের গোছা থাকে, ইহাদের লেজেও সেই রকম কয়েকগাছি চুল দেখা যায়।
