পিঁপ্ড়ের বাসা
পিঁপ্ড়েরা মাটির তলায় যে বাসা করে, গর্ত্ত খুঁড়িয়া তাহার ভিতরটা বোধ হয় তোমরা দেখ নাই। বাগানের মধ্যে বা মাঠে পিঁপ্ড়েরা ভিতর হইতে মাটি তুলিয়া যে বাসা প্রস্তুত করে, তাহা খুঁড়িয়া দেখিয়ো। পিঁপ্ড়ের বাসা চিনিয়া লওয়া কঠিন নয়। একটু নজর রাখিলেই তোমরা দেখিতে পাইবে, মাঠের এক-এক জায়গায় কালো বা লাল পিঁপ্ড়েরা গর্ত্ত হইতে দাঁতে করিয়া একটু একটু মাটি উঠাইয়া তাহা গর্ত্তের মুখে গোলাকারে সাজাইয়া রাখিতেছে। পিঁপ্ড়েরা এই রকমে যে কণা কণা মাটি উঠায়, তাহাতে গর্ত্তের মুখের চারিদিক্টা যেন প্রাচীর দিয়া ঘেরা হইয়া পড়ে। তোমরা যদি এই রকম পিঁপ্ড়ের গর্ত্ত খুঁজিয়া পাও, তবে সেখানে খুঁড়িলে মাটির ভিতরে উহাদের বাসা দেখিতে পাইবে।
পিঁপ্ড়ের বাসা বড়ই অদ্ভুত। ঘরের পর ঘর থাকে-থাকে মাটির ভিতরে সাজানো দেখা যায়। যাওয়া-আসা এবং চলাফেরার জন্য অনেক পথও সেই বাসার ভিতরে থাকে। রাজাদের বা বড়লোকদের বাড়ীর ঘরগুলি বেশ সাজানো গুছানো থাকে মাত্র, সেগুলিতে প্রায়ই কেহ বাস করে না। পিঁপ্ড়েদের সকল ঘরই পূর্ণ দেখিতে পাইবে। কোনো ঘরে কর্ম্মী পিঁপ্ড়েরা ডিমগুলিকে যত্নে রাখিয়া পাহারা দেয়। শুঁয়ো-পোকার আকারে যে-সকল বাচ্চা বাসায় থাকে, কোনো ঘরে তাহাদের যত্ন করা হয়। সেখানে অনেক কর্ম্মী-পিঁপ্ড়ে গা চাটিয়া বাচ্চাদের শরীরের ধূলা-মাটি সাফ্ করে এবং গলার খলিতে খাবার বোঝাই করিয়া আনিয়া তাহাদিগকে খাওয়াইতে থাকে। কোনো ঘরে হয় ত, পুত্তলি-অবস্থায় বাচ্চারা নিজের মুখের লালায় প্রস্তুত সূতা দিয়া আপাদমস্তক ঢাকিয়া মড়ার মত পড়িয়া থাকে এবং শত শত কর্ম্মী-পিঁপ্ড়ে পুত্তলিদের গায়ের মলা-মাটি মুছিয়া যত্ন করে।
বাসার উপর ও মাঝের তলার ঘরগুলিতে এই সকল কাজ চলে, এবং সকলেই ব্যস্ত হইয়া নিজেদের কর্ত্তব্য করিয়া যায়। কোনো উপর-ওয়ালার তাগিদের জন্য প্রতীক্ষা করিয়া সময় নষ্ট করে না।
বাসার নীচের তলাটা অনেকটা নিরিবিলি। ইহাই পিঁপ্ড়েদের রাণীর অন্দর মহল। কর্ম্মীদের মুখ হইতে খাবার লইয়া আহার করা এবং ধারাবাহিক ডিম-পাড়াই রাণীর কাজ। আমাদের রাণীর যেমন অনেক দাস-দাসী ও সহচরী সঙ্গে থাকিয়া রাণীর হুকুম তামিল করে, পিঁপ্ড়েদের রাণীর সঙ্গেও সেই রকম অনেক সঙ্গী ঘুরিয়া বেড়ায়। পিঁপ্ড়েদের রাণী সৌখীন নয়; কাজেই তাহার মন জোগাইবার জন্য সঙ্গীদের বিশেষ খাটিতে হয় না। অন্দর মহলের ঘরে ঘরে বেড়াইয়া রাশি রাশি ডিম পাড়াই রাণীর একমাত্র সখ্। ডিম পাড়িবা-মাত্র রাণীর সঙ্গীরা সেগুলিকে মুখে করিয়া পৃথক্ ঘরে যত্ন করিয়া রাখিয়া দেয়। পাছে ডিম নষ্ট হইয়া যায়, এই ভয়েই অনেক কর্ম্মী পিঁপ্ড়ে সর্ব্বদা রাণীর পিছনে ঘুরিয়া বেড়ায়।
স্ত্রী ও পুরুষ-পিঁপ্ড়ে
রাণী প্রথমে কেবল কর্ম্মী পিঁপ্ড়ের ডিম প্রসব করে। ইহা শেষ হইলে সে কিছুদিন ধরিয়া স্ত্রী ও পুরুষ পিঁপ্ড়ের ডিম পাড়িতে থাকে। এই ডিমগুলির আকার কিছু বড়। যাহা হউক, সেগুলি হইতে সম্পূর্ণ আকারে পিঁপ্ড়ে বাহির হইলে বাসার সকলেই ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়ে। স্ত্রী ও পুরুষ-পিঁপ্ড়ের ডানা থাকে। তাহারা জন্মিয়াই গর্ত্তের বাহিরে আসিবার চেষ্টা করে। কর্ম্মী পিঁপ্ড়েরা জোর করিয়া তাহাদিগকে গর্ত্তের মধ্যে ধরিয়া রাখে। কিন্তু মৌমাছির চাকে যেমন স্ত্রী-মাছিদের মধ্যে ক্রমাগত ঝগ্ড়াঝাঁটি চলে, ইহাদের মধ্যে তাহা দেখা যায় না। স্ত্রী, পুরুষ এবং কর্ম্মী সকলে মিলিয়া মিশিয়া বাস করে।
যাহা হউক, বাসায় স্ত্রী ও পুরুষ পিঁপ্ড়ের সংখ্যা যখন বেশি হইয়া পড়ে, তখন কর্ম্মীরা তাহাদিগকে আর আট্কাইয়া রাখিতে পারে না। শেষে হঠাৎ এক দিন গর্ত্ত ছাড়িয়া দলে দলে উপরে উঠিতে আরম্ভ করে। পুরুষ-পিঁপ্ড়েরা একবার উপরে উঠিলে আর গর্ত্তে ফিরিয়া আসে না। কিছুক্ষণ উড়িলেই তাহাদের ডানা খসিয়া যায় এবং অনেকেই মরিয়া যায়; আবার কতকগুলিকে পাখী, ব্যাঙ্ প্রভৃতি কাছে পাইয়া খাইয়া ফেলে। ডানা-ওয়ালা অনেক স্ত্রী-পিঁপ্ড়েরও এই রকমে অপমৃত্যু হয়। কিন্তু কর্ম্মীরা সকলগুলিকে মরিতে দেয় না। তাহারা দলের স্ত্রীদের বিপদ্ দেখিলেই চারিদিক্ হইতে ছুটিয়া আসে এবং সেই সাঁড়াসির মত দাঁত দিয়া ধরিয়া তাহাদিগকে গর্ত্তের ভিতরে লইয়া যায়। ইহার পর স্ত্রীরা আর গর্ত্তের বাহিরে আসে না। গর্ত্তের ভিতরে গিয়া উহাদের প্রত্যেকেই একএকটি রাণী হইয়া দাঁড়ায় এবং ডিম পাড়িতে সুরু করে। যে-সকল স্ত্রী-পিঁপ্ড়ে উড়িতে উড়িতে গর্ত্ত হইতে দূরে আসিয়া পড়ে, কর্ম্মীরা তাহাদের সন্ধান পায় না। ইহারা নিজেই নিজেদের ডানা কাটিয়া ফেলে এবং পরে একটি ছোট গর্ত্ত খুঁড়িয়া সেখানে ডিম পাড়িতে আরম্ভ করে। এই রকমে কখনো কখনো পিঁপ্ড়েদের এক-একটা নূতন বাসার সৃষ্টি হইয়া পড়ে।
পিঁপ্ড়ের বাসা-ত্যাগ
এক জায়গায় বহুকাল বাস করিলে, তাহা ক্রমে বাসের অনুপযুক্ত হয়। তখন হয় ত মড়ক বা অন্য কিছু উৎপাত দেখা দিয়া সেখানকার লোকজনকে দেশ-ছাড়া করে। আমাদের দেশের অনেক পুরানো গ্রাম ও নগর এই রকমে নষ্ট হইয়া গিয়াছে। হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমান রাজাদের রাজধানী গৌড় এক সময়ে খুব বড় সহর ছিল। ইহা বোধ হয় তোমরা ইতিহাসে পড়িয়াছ। কিন্তু এখন তাহা জনশূন্য ঘোর জঙ্গল। গৌড়ের বড় বড় সুন্দর বাড়ী ভাঙিয়া চুরিয়া মাটির সঙ্গে মিশিয়া রহিয়াছে। এক সময়ে ভয়ানক মড়কের ভয়ে লোকজন দেশ ছাড়িয়া পলাইয়াছিল বলিয়াই গৌড়ের এমন দুর্দ্দশা। পিঁপ্ড়েরা মাটির নীচে যে-সকল নগরের মত বাসা বানায়, তাহাতে উহারা চিরকাল থাকিতে পারে না। বাসের একটু অসুবিধা হইলে বা কোনো রকম মড়ক দেখা দিলে, তাহার বাসা ছাড়িয়া নূতন জায়গায় বাসা তৈয়ার করে। তোমরা এই রকম বাসা-ভাঙা পিঁপ্ড়ের দল দেখ নাই কি? বাসা ভাঙার সময়ে অসংখ্য পিঁপ্ড়ে সারি বাঁধিয়া নূতন জায়গার দিকে চলে। বাসায় যে-সকল ডিম, বাচ্চা ও পুত্তলি-পিঁপ্ড়ে থাকে, সেগুলিকে তাহারা ফেলিয়া যায় না। তোমরা যদি লক্ষ্য কর তবে প্রত্যেক কর্ম্মী পিঁপ্ড়েকে তখন একএকটি সাদা জিনিষ মুখে লইয়া চলিতে দেখিবে। ঐ জিনিষগুলি পুত্তলি-পিঁপ্ড়ে। পুত্তলি-অবস্থায় পিঁপ্ড়ের বাচ্চা মড়ার মত পড়িয়া থাকে, এজন্য সেগুলিকে মুখে করিয়া লইয়া যাইতে কর্ম্মীদের কোনো কষ্ট হয় না।
