মৌমাছির আয়ু
মৌমাছিরা বেশি দিন বাঁচে না। কর্ম্মী মাছিদের খুব বেশি পরিশ্রম করিতে হয়। এই কারণে দেড় মাসের মধ্যে ইহারা মারা যায়। যখন পরিশ্রম বেশি না থাকে, তথন ইহারা তিন মাস পর্য্যন্ত বাঁচে। পুরুষ-মাছিরা কখনো কথনো দু’মাস পর্য্যন্ত বাঁচে। কিন্তু প্রায়ই ইহারা রাণীর সঙ্গে বেড়াইতে বাহির হইয়া মারা যায়। পুরুষ-মাছি একবার চাক ছাড়িয়া উড়িয়া গেলে, সে আর প্রায়ই চাকে ফিরিয়া আসে না। স্ত্রী-মাছিদেরই আয়ু বেশি। কখনো কখনো ইহাদিগকে দুই হইতে তিন বৎসর পর্য্যন্ত বাঁচিয়া থাকিতে দেখা যায়।
মৌমাছির দল
প্রত্যেক দলে হাজার হাজার মাছি থাকে, কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, কোনো মাছি নিজের দল ছাড়িয়া অন্য দলের চাকে যায় না এবং গেলেও সেখানে জায়গা পায় না। তোমাদের গ্রামে যদি তিন হাজার লোক বাস করে, তবে প্রত্যেক লোককে চিনিয়া রাখা কত কঠিন, তাহা মনে করিয়া দেখ। কিন্তু মৌমাছিরা নিজের দলের সকল মাছিকেই চিনিয়া রাখে। যদি অপর চাকের মাছি ভুল করিয়া তাহাদের চাকে আসিতে চায়, তবে পাহারাওয়ালা মাছিরা নূতন মাছিকে তাড়াইয়া দেয়। মাছিরা দলের সকলকে কি-রকমে চিনিয়া রাখে, তাহা বোধ হয় তোমরা জান না। যাঁহারা মৌমাছির চলা-ফেরা অনুসন্ধান করিয়াছেন, তাঁহারা বলেন, প্রত্যেক চাকের মৌমাছিদের গায়ে এক-এক রকম গন্ধ আছে। এই গন্ধ শুঁকিয়া মাছিরা আপনার দলের মাছিদিগকে চিনিয়া লয়। পরীক্ষা করিয়া দেখা গিয়াছে, যদি কোনো চাকের কতকগুলি মাছিকে তিন-চারি ঘন্টা ধরিয়া রাখা যায়, তাহা হইলে উহাদের গায়ের গন্ধ লোপ পায়। তখন সেই মাছিদিগকে ছাড়িয়া দিলে, তাহারা মহা বিপদে পড়ে। গায়ের গন্ধ না থাকায় নিজের চাকের মাছিরা তাহাদিগকে চিনিতে পারে না। কাজেই অনেক সাধ্যসাধনা করিয়াও তাহারা চাকে জায়গা পায় না।
তোমাদিগকে এ-পর্য্যন্ত কেবল চাকের মাছিদের কথাই বলিলাম। ইহা ছাড়া আরো অনেক রকম মৌমাছি আছে। কিন্তু ইহাদের মধ্যে কেহই চাক বাঁধিয়া একত্র বাস করে না। অনেকেই কুমরে-পোকাদের মত পৃথক্ বাসা বাঁধিয়া বাচ্চাদের লালন-পালন করে। এক রকম মাছি গাছের আঠা জোগাড় করিয়া বইয়ের আলমারির গায়ে বাসা বাঁধে,—ইহারাও মৌমাছি-জাতীয় প্রাণী। আবার এক জাতি মৌমাছিকে গাছের পাতা কাটিয়া বাসা তৈয়ার করিতে দেখা যায়।
যাহা হউক, মৌমাছির জীবনের সকল কথাই বড় আশ্চর্য্যজনক। এ-রকম ছোট প্রাণী যে এত বুদ্ধি খাটাইয়া চাক বাঁধিয়া বাসা করিতে পারে, ইহা যেন আমাদের বিশ্বাসই হয় না। কিন্তু ইহার সকলি সত্য।
৬.২.৬ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : পিপীলিকা
পিপীলিকা
এইবার আমরা পিঁপ্ড়ের কথা বলিব। ইহারা মৌমাছি ও বোল্তার দলের প্রাণী, কিন্তু তাহাদের চেয়ে অনেক বুদ্ধিমান্। হাতী ঘোড়া বাঘ ভালুক প্রভৃতি বড় প্রাণীরা বুদ্ধি খরচ করিয়া যাহা করিতে না পারে, পিঁপ্ড়েরা তাহা করে। এই পৃথিবীতে মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীই পিঁপ্ড়ের মত বুদ্ধিমান্ নয়।
পিঁপ্ড়েরা নিজের তৈয়ারি ঘরে দল বাঁধিয়া বাস করে, দলের উন্নতির জন্য প্রাণপণে পরিশ্রম করে, নিজেদের ঘর বাড়ী ও ছেলেপিলেদের রক্ষা করিবার জন্য শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে। ইহাদের ভাষা নাই বটে, কিন্তু নানা রকমে মনের ভাব পরস্পরকে জানাইতে পারে। আমরা যেমন গোরু পুষিয়া তাহার দুধ খাই, ইহারাও তেমনি এক রকম পোকা পুষিয়া সেগুলির নিকট হইতে মিষ্ট খাদ্য আদায় করিয়া লয়। আবার দুই এক রকম পিঁপ্ড়ে আমাদের মত চাষ-আবাদও করে। ইহার ঘাসের ছোট বীজ মুখে করিয়া বহিয়া আনে এবং তাহা বুনিয়া শস্য উৎপন্ন করে। সুতরাং সাধারণ বুদ্ধিতে পিঁপ্ড়েরা মানুষের চেয়ে খুব কম নয়।
ভালো আতসী-কাচ দিয়া দেখিলে পিঁপ্ড়েকে যে-রকম দেখায় এখানে তাহার একটা ছবি দিলাম। ছবিতে পিঁপ্ড়ের বুক ও লেজের জোড়ের জায়গায় বলের মত দুইটি পিণ্ড আছে। ইহা পিঁপ্ড়ের দেহের প্রধান চিহ্ন। কোনো কোনো পিঁপ্ড়ের দেহে ঐ-রকম একটি মাত্র পিণ্ড থাকে।
মৌমাছি ও বোল্তার মতই পিঁপ্ড়েদের মধ্যে স্ত্রী-পুরুষ ও কর্ম্মী এই তিন জাতি আছে। স্ত্রী ও কর্ম্মী পিঁপ্ড়ের লেজের অংশটা প্রায়ই ছয় থাক্ আংটি জুড়িয়া প্রস্তুত হয়। পুরুষদের লেজে সাত থাক্ আংটি থাকে। কিন্তু ইহাদের সকলেরি ছয়খানা লম্বা পা এবং মাথায় একজোড়া শুঁয়ো থাকে। পিঁপ্ড়ের শুঁয়ো বোল্তা বা মৌমাছির শুঁয়োর মত নয়। আমাদের হাত ও পা যেমন কতকগুলি ছোট ও বড় খণ্ড খণ্ড অংশ জুড়িয়া প্রস্তুত, পিঁপ্ড়ের শুঁয়োও ঠিক সেই রকম দুইটি খণ্ড জুড়িয়া প্রস্তুত হয়। মৌমাছিদের পায়ে চিরুণীর দাঁতের মত যে-সকল কাঁটা লাগানো আছে, ইহাদের পায়েও ঠিক তাহাই দেখা যায়। গায়ে মাথায় বা শুঁয়োতে ধূলা মাটি বা অন্যান্য কোন আবর্জ্জনা লাগিলে, উহারা পায়ের চিরুণী দিয়া তাহা ঝাড়িয়া ফেলে। তোমরা যদি কিছুক্ষণ কোনো পিঁপ্ড়ের চলা-ফেরা লক্ষ্য কর, তবে দেখিবে, সে মাঝে মাঝে দাঁড়াইয়া পা দিয়া শুঁয়ো ঘসিতেছে। শরীরের ময়লা মাটি ছাড়াইবার জন্যই উহারা ঐ-রকম করে। গোরু যেমন জিভ দিয়া বাছুরের গা চাটে ও গায়ের ময়লা ছাড়াইয়া দেয়, পিঁপ্ড়েরা সেই রকমে পরস্পরের গায়ে পা বা শুঁয়ো বুলাইয়া শরীরের ধূলা মাটি পরিষ্কার করে।
