এক দিন কিছু না খাইলে মানুষ দুর্ব্বল হইয়া পড়ে। তিন-চারি দিন কিছু না খাইলে মানুষের বাঁচিয়া থাক দায় হয়। কিন্তু পতঙ্গের পুত্তলিরা আট-দশ মাস কিছু না খাইয়া কি রকমে বাঁচে, তাহা আমরা হঠাৎ বুঝিতে পারি না।
একটা উদাহরণ দিলে এই কথাটা তোমরা বুঝিতে পারিবে। মনে কর, আমরা আগুন জ্বালাইতে যাইতেছি। কাঠ খড় তেল কয়লা জোগাড় করিয়া তাহাতে আগুন দিলাম। আগুন দাউ দাউ করিয়া জ্বলিল, এবং কাঠ খড় পুড়িয়া গেলে তাহা নিবিয়া গেল। প্রাণীর জীবন এই আগুনেরই মত নয় কি? আগুন জ্বালাইতে গেলে যেমন কাঠ বা খড়ের প্রয়োজন, তেমনি জীবনের কাজ চালাইতে গেলে খাবারের প্রয়োজন। এই খাবার শরীরে গিয়া যে শক্তির উৎপত্তি করে, তাহারি জোরে আমরা হাঁটিয়া বেড়াই, কাজকর্ম্ম করি ও শরীরকে পুষ্ট করি। কাজেই যদি আাহার বন্ধ করা যায়, তবে কাঠের অভাবে যেমন আগুন নিভিয়া যায়, সেই রকম অনাহারে আমাদের মৃত্যু ঘটে। শুঁয়ো-পোকারা পুত্তলি হইয়া চলা-ফেরা একবারে বন্ধ করে, এমন কি শ্বাস-প্রশ্বাস পর্য্যন্ত রোধ করিয়া ফেলে। কাজেই জীবন-ধারণের জন্য তাহাদের অতি অল্প শক্তিরই প্রয়োজন হয়। এই জন্যই পতঙ্গেরা পুত্তলি-অবস্থায় অনাহারে অনেক দিন কাটাইতে পারে।
খুব ভালো খাবার খাইয়া শরীর মোটা করিলে দেহের ভিতরে মাংস চর্ব্বি প্রভৃতি অনেক সারবান্ জিনিস জমা হয়। যখন বাহির হইতে খাবার পাওয়া যায় না, মোটা প্রাণীরা তখন নিজেদের দেহের সেই মাংস ও চর্ব্বি খরচ করিয়া অনেক দিন অনাহারে বাঁচিতে পারে। শুঁয়ো-পোকারা দিবারাত্রি আহার করিয়া কি-রকম মোটা হয়, তাহা আগে বলিয়াছি। কাজেই শরীরে যে মাংস ও চর্ব্বি জমা থাকে, তাহাও পুত্তলিদিগকে অনেক দিন বাঁচাইয়া রাখিতে পারে।
পুত্তলি-অবস্থায় মড়ার মত গুটির মধ্যে পড়িয়া থাকিলেও এই সময়ে শুঁয়ো-পোকাদের দেহে একটা বড় রকমের পরিবর্ত্তন হয়। আমরা কাদা দিয়া পুতুল গড়িয়া, পরে তাহা ভাঙিয়া যেমন আর একটি নূতন পুতুল গড়িয়া থাকি,—বিধাতা ঐ-সময়ে গুটির মধ্যের শুঁয়ো-পোকাগুলিকে ভাঙিয়া-চুরিয়া সেই রকমে তাহাদিগকে সম্পূর্ণ পতঙ্গের আকারে পরিণত করেন। শুঁয়ো-পোকার ডানা থাকে না, অনেকের পা থাকে না, এবং সেই বড় বড় চোখও থাকে না৷ গুটির মধ্যে উহারা যখন অজ্ঞাতবাস করে, তখনই তাহাদের মাথা, পা, ডানা, চোখ প্রভৃতি সকল অঙ্গেরই সৃষ্টি হয় এবং শেষে এক দিন সেই শুঁয়ো-পোকাই সুন্দর প্রজাপতি বা সম্পূর্ণ পোকার আকার পাইয়া গুটি কাটিয়া বাহির হয়। ইহাই পতঙ্গদের জীবনের তৃতীয় অবস্থা।
আমরা ক্রমে ক্রমে পতঙ্গদের চারিখানি ছবি দিয়াছি। এইগুলি দেখিলে পতঙ্গদের তিন অবস্থার কথা তোমরা ভালো করিয়া বুবিবে।
ডিম হইতে বাহির হইয়া শুঁয়ো-পোকা কি রকমে গাছের পাতায় বেড়াইতেছে, তাহা প্রথম ছবিতে আঁকা আছে। দ্বিতীয় চিত্রটি তাহারি পুত্তলি-অবস্থার ছবি। গায়ের চাম্ড়ায় লালা মিশাইয়া শুঁয়ো-পোকাটি কেমন গুটি পাকাইয়াছে এবং গুটির মধ্যে কেমন মড়ার মত পড়িয়া আছে, এই ছবিতে তাহা আঁকা হইয়াছে। তৃতীয় ছবিখানি সেই পোকারই গুটি কাটিয়া বাহির হওয়ার চিত্র। সম্পূর্ণ প্রজাপতির আকার পাইয়া সেই শুঁয়ো-পোকাই গুটি হইতে বাহির হইয়াছে, কিন্তু এখনো ডানা মেলিয়া উড়িতে পারিতেছে না। সেই প্রজাপতিই কি-রকমে ডানা মেলিয়া উড়িবার উপক্রম করিতেছে, তাহা চতুর্থ চিত্রে আঁকা রহিয়াছে।
এখন বোধ হয় তোমরা বুঝিতে পারিয়াছ—পতঙ্গেরা মায়ের দেহ হইতে সম্পূর্ণ পতঙ্গের আকারে বাহির হয় না। প্রথমে তাহারা ডিম হইতে শুঁয়ো-পোকার আকারে বাহির হয়। তার পরে উহারা মড়ার মত গুটির মধ্যে বাস করে এবং শেষে তাহারা গুটি কাটিয়া সম্পূর্ণ পতঙ্গের আকারে বাহির হইয়া পড়ে। ইহাই পতঙ্গদের জীবনের তিন অবস্থা।
৬.১০.১ সহস্রপদী : তেঁতুলে-বিছা
সহস্রপদী
(Myriapods)
তেঁতুলে-বিছা
তেঁতুলে-বিছা তোমরা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। বড় জাতের বিছা সাত আাট ইঞ্চি পর্য্যন্ত লম্বা হয়। খোলা ছাড়াইলে পাক তেঁতুলকে যে রকম দেখায়, ইহাদের গায়ের রঙ্ ও আকৃতি সেই রকম বলিয়াই ইহাদিগকে তেঁতুলে-বিছা বলে।
বিছার মুখে দুইটি শুঁয়ো থাকে। তার পরে খাবার ধরিবার জন্য চোয়াল ও একজোড়া দাঁতও থাকে। ইহাদের দেহ যতগুলি আংটি জুড়িয়া প্রস্তুত হয়, তাহার প্রত্যেক আংটি হইতে এক এক জোড়া পা বাহির হয়। প্রথম পা জোড়াটি আকার বদ্লাইয়া দাঁত হইয়া দাঁড়াইয়াছে। দাঁত দুটির রঙ্ প্রায়ই কালো হয় এবং ভয়ানক ছুঁচ্লো থাকে।
বিছাতে কামড়াইলে ভয়ানক জ্বালা করে। ইহাদের দাঁতের আগায় খুব সরু ছিদ্র এবং দাঁতের গোড়ায় বিষের থলি থাকে। কামড়াইলেই ঐ থলি হইতে বিয আসিয়া দাঁতের ছিদ্র দিয়া কামড়ের জায়গায় লাগে। ইহাই জ্বালা-যন্ত্রণা সুরু করে।
বিছাদের মাথার দুই পাশে দুইটা করিয়া কালো চোখ থাকে, হঠাৎ দেখিলে এগুলিকে সাধারণ চোখ বলিয়াই মনে হয়। কিন্তু তাহা নয়। তোমরা যদি আাতসী কাচ দিয়া পরীক্ষা কর, তবে প্রত্যেক চোখের কালো দাগের উপরে চারিটা করিয়া ছোট চোখ সাজানো দেখিতে পাইবে। সুতরাং বলিতে হয়, বিছার আটটি করিয়া চোখ আছে। এই সকল চোখ দিয়া দেখিয়া ও শুঁয়ো দিয়া ছুঁইয়া অন্ধকার রাত্রিতেও বিছারা খাবার সংগ্রহ করিতে পারে। শুঁয়ো দুটির প্রত্যেকটিতে কুড়িটা করিয়া জোড় আছে, তাই ইহারা যেদিকে-ইচ্ছা শুঁয়ো নড়াইতে পারে।
