এখানে তারা-মাছের আর একটা ছবি দিলাম। ইহা দেখিলে তাহার হাত ও মুখের চারিদিকের অবস্থান জানিতে পারিবে। ছবির ঝাঁঝরিওয়ালা অংশটা জলপ্রবেশের পথ। তার পরে, মাছের কাঁটার মত আর যে সব অংশ দেখিতেছ,—সেগুলি সত্যই কাঁটা নয়,—জলের নল। কলিকাতা বা ঢাকার মত বড় সহরের মাটীর তলা যেমন নর্দ্দমা ও জলের নলে আচ্ছন্ন থাকে,—তারা মাছের সর্ব্ব শরীর সেই রকম নলে নলে ঢাকা আছে। ছবির দুই পাশে চিরুণীর দাঁতের মত অংশগুলি তারা-মাছের পা। আগেই বলিয়াছি এগুলি ফাঁপা নল, কেবল বাহিরের মুখটা বন্ধ। ঝাঁঝরি-ওয়ালা পথ দিয়া জল দেহে প্রবেশ করে এবং তার পরে ঐ সকল নল দিয়া তাহা শরীরে চলাফেরা করে। কাজেই বাহিরের জল যখন ঝাঁঝরি দিয়া আসিয়া ঘুরিয়া ফিরিয়া পায়ের নলে পৌঁছে, তখন পা খাড়া হইয়া উঠে এবং যখন জল না আসে, তখন উহা গুটানো অবস্থায় থাকে।
প্রত্যেক পায়ের গোড়ায় এক একটি গাঁটের মত যে অংশ দেখিতে পাইতেছ, সেগুলি জলের থলি। তারা-মাছ ঐ সকল থলিতে জল জমাইয়া রাখে এবং যখন এক জায়গা হইতে অন্য জায়গায় যাইবার দরকার হয়, তখন জল টানিয়া পায়ের নল খাড়া করে এবং চলিতে আরম্ভ করে। এই রকমে চলিয়া বেড়াইবার উপায়, আর কোনো প্রাণীর শরীরে দেখা যায় না।
অক্সিজেন বাষ্প দেহে না লইলে প্রাণীরা বাঁচে না। জলে যে বাতাস মিশানো থাকে, তাহাতে অনেক অক্সিজেন বাষ্প থাকে—ইহা তোমরা আগেই শুনিয়াছ। শরীরের নলের ভিতর দিয়া যে জল যাওয়া-আসা করে, তারা-মাছেরা তাহা হইতে অক্সিজেন্ বাষ্প চুষিয়া লইয়া জীবিত থাকে। গোরু, ভেড়া, মানুষ প্রভৃতি প্রাণীরা বাহিরের বাতাস নাক দিয়া দেহের মধ্যে টানিয়া লয় এবং শেষে শরীরের ভিতরকার ফুস্ফুস্ সেই বাতাসের অক্সিজেন শুষিয়া লয়। মাছ ও কাঁকড়াদের নাক বা ফুস্ফুস্ নাই; কান্কো দিয়া ইহারা ফুস্ফুসের কাজ চালায়। ইহারা কান্কো দিয়াই জলে-মিশানো বাতাসের অক্সিজেন টানিয়া লয়। তারা-মাছদের দেহের উপরে কান্কোর মত কতকগুলি অংশ আছে, ইহারা কখনো কখনো সেই পথেও অক্সিজেন টানিয়া লইতে পারে।
আমরা এ-পর্য্যন্ত যে-সকল প্রাণীর কথা বলিয়াছি, তাহাদের মধ্যে কোনোটিরই স্ত্রী-পুরুষ ভেদ দেখা যায় নাই। কিন্তু তারা-মাছদের কতক স্ত্রী এবং কতক পুরুষ হইয়া জন্মে। স্ত্রী-মাছের প্রত্যেক হাতের গোড়ায় ডিম রাখিবার জায়গা আছে। সেখানে ডিম জন্মিয়া বড় হইলে, তাহা হইতে ছোটো ছোটো তারা-মাছ বাহির হয়।
মানুষ, বানর, শিয়াল, কুকুর প্রভৃতি বড় জন্তুদের যদি হাত, পা বা অপর কোনো অঙ্গ নষ্ট হইয়া যায়, তবে তাহার জায়গায় আর নূতন অঙ্গ গজায় না। আমাদের চুল বা নখ কাটা পড়িলে, সেইগুলিকেই কেবল নূতন করিয়া গজাইতে দেখা যায়। কিন্তু খুব নিকৃষ্ট প্রাণীর কোনো বিশেষ অঙ্গ নষ্ট হইলে, শূন্য স্থানে আপনা হইতেই নূতন অঙ্গ উৎপন্ন হয়। কোনো রকম আঘাত পাইলে টিকটিকির লেজ খসিয়া। যায়—ইহা তোমরা দেখ নাই কি? কিন্তু একবার লেজ খসিলে টিক্টিকি চিরদিনই লাঙ্গুলহীন থাকে না। কিছুদিনের মধ্যেই তাহার নূতন লেজ গজাইতে আরম্ভ করে। তারা-মাছেও ঠিক্ তাহাই দেখা যায়। কোনো রকমে যদি ইহাদের একটা হাত নষ্ট হইয়া যায়, তাহা হইলে কয়েক দিনের মধ্যেই শূন্য জায়গায় আবার নূতন হাত গজাইয়া উঠে। কেবল ইহাই নয়,—তোমরা যদি একটি তারা-মাছকে ধরিয়া তাহার শরীরের কিছু অংশের সহিত একখানা হাত কাটিয়া সমুদ্রের জলে ফেলিয়া দাও, তবে তাহার সেই হাত হইতে একটি নূতন তারা-মাছের সৃষ্টি দেখিবে। ইহাদের যেন মৃত্যু নাই!
যাহা হউক, আমরা তারা-মাছের যে অল্প পরিচয় দিলাম তাহা হইতে তোমরা বোধ হয় বুঝিতে পারিয়াছ,—ইহারা খুব নীচু শাখার প্রাণীদের চেয়ে অনেক উন্নত। ইহাদের শরীরে পাকযন্ত্র, ডিম্বাশয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র ইত্যাদির এক-একটু চিহ্ন আছে। প্রাণীদের রক্তে সাদা এবং লাল, এই দুই রকমের কণিকা ভাসিয়া বেড়ায়। রক্তের লাল-কণিকাগুলির দ্বারাই তাহার রঙ্ লাল হয়। তারা-মাছদের শরীরেও রক্ত আছে, কিন্তু তাহাতে লাল-কণিকা নাই। এইজন্য ইহাদের রক্ত সাদা। যখন ছোট পা-গুলি বাহির করিয়া ইহারা সমস্ত শরীর দোলাইয়া চলিতে আরম্ভ করে, তখন চলার আন্দোলনে সেই সাদা রক্ত সমস্ত শরীরের ভিতরে চালাফেরা আরম্ভ করে। শরীরের সকল জায়গায় রক্ত চলাবার জন্য বড় বড় প্রাণীদের দেহে হৃদ্যন্ত্র আছে। তোমরা যেমন পিচ্কারি দিয়া রঙ্ ছিটাও, বড় প্রাণীদের দেহের হৃদ্পিণ্ড সেই প্রকারে শরীরের শিরা-উপশিরা দিয়া সর্ব্বাঙ্গে রক্ত চালাইয়া থাকে। কিন্তু তারা-মাছদের দেহে হৃদ্পিণ্ড পাওয়া যায় নাই।
স্নায়ুমণ্ডলী
প্রাণীদের মৃতদেহ কাটিয়া পরীক্ষা করিলে, তাহার সকল অংশে খুব সরু সূতার জালের মত একটি জিনিষ দেখা যায়। বড় বড় প্রাণীদেরও শরীর এই সূতার জালে আচ্ছন্ন থাকে। এই জালকে স্নায়ুমণ্ডলী বলে। চোখ দিয়া আমরা দেখি, কান দিয়া আমরা শুনি, নাক দিয়া আমরা গন্ধ পাই, জিভ দিয়া স্বাদ পাই, গায়ে চিম্টি কাটিলে বেদনা পাই—এই সকল বোধ স্নায়ুমণ্ডলীই উৎপন্ন করে। বড় প্রাণীদের মাথার ভিতরে যে মগজ অর্থাৎ মস্তিষ্ক আছে, শরীরের সকল স্নায়ুই সেই মস্তিষ্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে। শরীরের কোনো অংশে কোনো রকমে আঘাত লাগিলে সেই আঘাতের উত্তেজনা স্নায়ুর সূতা বহিয়া মস্তিষ্কে পৌঁছে এবং ইহাতে সেই আঘাত প্রাণীরা বুঝিতে পারে।
