নন্দবাবু নিজেও টের পেলেন, সত্যিই তাঁর দারুণ খিদে পেয়েছে, খিদেটা রাগী একটা হুলো বেড়ালের মতো তার পেটটাকে আঁচড়ে কামড়ে ফালাফালা করে ফেলেছে।
মন একটু হেসে বলল, “ওঠো হে নন্দবাবু।”
“উঠে কী করব?”
“দোতলায় যাও নন্দবাবু। এখনও কিছু আছে বোধহয়।”
“ছিঃ মন, ওকথা বলতে নেই।”
“তোমার খিদে কিন্তু রেগে উঠছে নন্দবাবু। কাজটা ভাল হচ্ছে না। রাত এখন নিশুতি, কেউ টেরটিও পাবে না।”
নন্দবাবু বিরস মুখ করে বললেন, “তোর পেটে বড় জিলিপির প্যাঁচ রে মন।”
“নন্দবাবু, উপোস করে ধর্ম হয় না। খারাপই যদি হবে তবে বিরিয়ানি জিনিসটার সৃষ্টি হল কেন বলো? ওঠো নন্দবাবু, না উঠলে আমি তোমার সঙ্গে এমন ঝগড়া লাগাব যে, সাধন-ভজন চুলোয় যাবে।”
“উঠছি রে মন, উঠছি।”
নন্দবাবু উঠলেন, তারপর সিঁড়ি বেয়ে অনিচ্ছের সঙ্গে ওপরে উঠতে লাগলেন।
ওদিকে নিশুত রাতে ল্যাবরেটরির মধ্যে দুলালবাবুও চোখ মেলে চাইলেন।
চেয়ে তাঁর মনে হল, কী যেন একটা নেই।
কী নেই? দুলালবাবু উঠে বসে চারদিকে চাইলেন। কিন্তু কিছু বুঝতে পারলেন।
দুলালবাবুর হঠাৎ খেয়াল হল, তাই তো! আমি লোক্টা কে? আমার নাম কী? আমি কোথায় ছিলাম? এখানেই বা এলাম কী করে?
এসব প্রশ্নের কোনও সদুত্তর পাওয়া গেল না।
দুলালবাবু উঠে চারদিকটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। চারদিকে মেলা অকাজের জিনিস। শিলিং-এ গুচ্ছের গ্যাসবেলুন।
দুলালবাবুর হঠাৎ নজরে পড়ল, একটা বেঁটেমতো লোক অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে আছে একটা টেবিলের তলায়।
দুলালবাবু গিয়ে লোকটাকে হঠাৎ জাপটে ধরলেন।
“এই, আমি কে?”
লোকটা ভড়কে গিয়ে ককিয়ে উঠল, “আজ্ঞে?”
“আমি কে, বল শিগগির।”
লোকটা মাথা নেড়ে বলল, “আজ্ঞে, সেটা বলা খুব শক্ত। আপনি যে কে তা আপনি ছাড়া আর কে জানবে বলুন। তবে আমি হচ্ছি গে পাঁচু মোদক।”
দুলালবাবু লোকটাকে আরও একটু কষে চেপে ধরে বললেন, “পাঁচু মোদক! নামটা চেনা-চেনা ঠেকছে!”
লোকটা ককিয়ে উঠে বলল, “আজ্ঞে, অত জোরে ধরবেন না। আমার হাড়গোড় তেমন পোক্ত নয়। ভাঙলে আর এ বয়সে জোড়া লাগবে না।”
“নামটা চেনা-চেনা ঠেকছে কেন বলো তো হে।”
এই বলে দুলালবাবু লোকটাকে ছেড়ে দিলেন। লোকটা অমনি ধুপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ে কিছুক্ষণ ‘উঃ, আঃ করে নিয়ে বলল, “হাড়গোড় একেবারে নড়িয়ে দিয়েছেন মশাই। আপনার মতো গুণ্ডা প্রকৃতির লোক আমি জীবনে দেখিনি। লোহার ভীমও চূর্ণ হয়ে যায়।
দুলালবাবু আত্মবিস্মৃত হয়েছেন। পুরনো কথা তাঁর মনে নেই। তিনি যে নিতান্তই রোগা, দুর্বল এবং ভীরু প্রকৃতির মানুষ এটাও তিনি ভুলে বসে আছেন। লোকটার দিকে খনিকক্ষণ চেয়ে থেকে তিনি বললেন, “তোমার নামটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। চমৎকার নাম। পাঁচু মোদক। আজ থেকে নামটা আমি নিলুম। তুমি অন্য নাম নাও।”
পাঁচু মোদক নিজের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “তা নিতে পারেন, তবে পয়সা লাগবে।”
“তুমি কি নাম বিক্রি করো নাকি?”
“আগে কখনও করিনি, কেউ চায়ওনি। আজই প্রথম। বউনি বলে কথা। কম করেই দেবেন না হয়। পাঁচ টাকা।”
দামটা খুব বেশি বলে মনে হল না দুলালবাবুর। কিন্তু দরাদরি করার মজ্জাগত অভ্যাস যাবে কোথায়? তিনি একটু চিন্তিতভাবে বললেন, “পাঁচ টাকা! দরটা একটু বেশি হয়ে গেল না!”
পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “নামের তো একটা রেট আছে মশাই। পাঁচ অক্ষরের নাম, অক্ষরপ্রতি একটা করে টাকা এমন কি বেশি?”
দুলালবাবু কর গুনে দেখলেন, পাঁচু মোদক পাঁচ অক্ষরের নাম বটে। একেবারে জলের মতো সোজা হিসেব। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “তা বটে!”
পাঁচু সোৎসাহে বলল, “তার ওপর ভেবে দেখুন, আপনাকে বেচে দিচ্ছি বলে বাপের দেওয়া নামটা আমি তো আর ব্যবহারও করতে পারব না। সেই জ্ঞান বয়স থেকেই লোকে পাঁচু-পাঁচু বলে ডেকে আসছে। এখন থেকে তো আর পাঁচু নামে সাড়াও দেওয়া চলবে না। দুঃখের কথাটা একটু ভেবে দেখবেন তো।”
দুলালবাবুর চোখ ছলছল করতে লাগল। বললেন, “নামটা দিতে যদি তোমার কষ্ট হয় তা হলে বরং থাক আমি বরং অন্য কোনও নাম…”
পাঁচু জিভ কেটে তাড়াতাড়ি দুলালবাবুর পায়ের ধুলো নিয়ে বলল, “কী যে বলেন আজ্ঞে, শুনলেও পাপ হয়। আমার নামটা যে আপনি নিলেন সেটাও আমার কম ভাগ্যি নাকি। আর দিয়ে যখন ফেলেছি তখন আর ফেরত নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।”
দুলালবাবু নিশ্চিন্ত হলেন। আসলে তাঁর এখন একটা নাম ভীষণ দরকার। নাম ছাড়া কি মানুষের চলে? তিনি গিয়ে তাঁর টিনের তোরঙ্গটি খুলে পাঁচটা টাকা বের করে পাঁচুর হাতে দিয়ে বললেন, “তা তুমি করোটরো কী?”
পাঁচু মাথা চুলকে বলল, “আজ্ঞে কথাটা বলা কি উচিত হবে? কী করি তা শুনলে আপনি হয়তো খুশি হবেন না।”
“কেন বলো তো?”
পাঁচু বুঝে গেছে, লোকটা পাগল, বোকা আবার হাবা। তাই সে খুব নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, “কাজটা অবশ্য খুবই ভাল। লোকে ভাল চোখে না দেখলেও এ কাজে মোটা লাভ।”
“কী বলো তো?”
পাঁচু খুব লজ্জার সঙ্গে মাথা চুলকে বলল, “আজ্ঞে, ওই চুরি আর কি।”
দুলালবাবু চুরি কথাটা খুব চেনেন। কিন্তু কী করলে চুরি করা হয়, তা তাঁর মনে পড়ল না। তাই তিনি পাঁচুর দিকে চেয়ে বললেন, “আমারও কিছু একটা করা দরকার। কাজ ছাড়া কি মানুষ থাকতে পারে? তা চুরি ব্যাপারটা কী আমাকে একটু বুঝিয়ে দাও তো! আমিও লেগে পড়ি।”